প্রভুর গোপালগঞ্জে লীলা প্রকাশ
জয় জয় রাইচাঁদ তুমি পরমেশ, কলিহত জীব লাগি ধর নব বেশ।
দ্বাপর যুগের ঋণ শুধিবার তরে, রাই নাম ধরে এলে অবনী মাঝারে।
যাঁহার স্মরণে প্রাণে প্রেম উপজয়, আনন্দেতে পরিপূর্ণ হইবে হৃদয়।
যাঁর নাম স্মরণেতে সর্ব দুঃখ যায়, রোগ-শোক জ্বরা-মৃত্যু নাহি কোন ভয়।
শাস্ত্রেতে লিখিত আছে তাঁর গুণগান, কিঞ্চিৎ লিখিত হেথা তাঁহার লক্ষণ।
নিগম কল্পতরুর সুধাময় ফল, অমৃত সমান যাহা সেই নাম বল।
মরোন্মুখী কেহ যদি লয় নাম তাঁর, তাহার প্রাণেতে হবে শক্তির সঞ্চার।
সংসার মাঝারে আছে যত আধি ব্যাধি, রাইচাঁদ নাম মাত্র তাহার ঔষধি।
রোগকালে নাম তাঁর করহ স্মরণ, নামের সঙ্গেতে রূপ জাগিবে যখন।
সেইক্ষণে জ্বালা তার উপসম হবে,
নামের মহিমা গুণ অবশ্যই পাবে।
অগ্নির দাহিকা শক্তি বৃথা কভু নয়,
অবিশ্বাসী জন তবু পুড়িবে নিশ্চয়। যে বিষ খাইলে মৃত্যু তাহা হয় সুধা,
রাই নামে সর্ব গুণ মিটে ভব ক্ষুধা। আপনি আচরি ধর্ম জীবে শিখাইতে,
ভগবান আবির্ভাব এই ধরণীতে। ঐশ্বর্য সম্পদ রত্ন নাহি চায় কছু, প্রেমের ঠাকুর তিনি দয়াময় বিছু। দীনহীন কাঙ্গালের ঘরে জনমিয়া,
দেখাইল জনে জনে নিজে আচরিয়া।
কিবা তাঁর ভাব কান্তি কিবা মধুরিমা,
প্রকাশিতে শক্য কেবা তাঁহার মহিমা? বিশ্বাস করিবে তারা সেই সাধুজন,
তাঁর ভক্ত সঙ্গে যাঁর হবে আলাপন। পাঁচুড়িয়াতে আশ্রম ঠাকুরের আছে
শহর গোপালগঞ্জ হয় তার কাছে। শহরের পর দিয়া যেত মাঝে মাঝে,
নদীকূল দিয়া যায় সাধারণ সাজে। সেকালে মিশন স্কুলে শিক্ষক প্রধান,
ছিলেন গিরিশ বাবু বিজ্ঞ ভক্তিমান। স্কুল পার্শ্বে ছিল তাঁর বসতির স্থল,
সদা সেথা যাতায়াত করে ভক্তদল। একদিন ভোর বেলা প্রভু অই পথে,
ভক্তসহ চলে রঙ্গে ভাবের জগতে।
চকিতে চাহিল প্রভু গিরীশের ঘরে,
উদ্দেশ্য রহস্য কিবা কে বলিতে পারে।
গুরু তাঁর শ্রীকুলদানন্দ ব্রহ্মচারী,
ঐখানে ঐদিন বসি দেখেন বিচারী।
সোনার মানুষ অই প্রেমের ঠাকুর,
নিকটে পাইয়া কেন রব এতদূর।
রাইচাঁদ যেই পথে হেঁটে চলে যায়, তফাৎ হইবে মাত্র দুই রশি প্রায়।
চেয়ারে বসিয়াছিল বাবুর বাসায়, তথা হতে নদীতট ভাল দেখা যায়।
মনের মানুষ যায় দেখে পথ দিয়া, সঙ্গেতে বহুত ভক্ত দেখিল চাহিয়া।
নিমেষেতে বিনা তারে জানাজানি হ'ল, উন্মনা হইয়া তিনি দাঁড়ায়ে পড়িল।
গিরিশ বাবুকে তবে বলে ব্রহ্মচারী, এই কোনজন হয় বল তাড়াতাড়ি।
অনিন্দ সুন্দররূপ ভুবন মোহন, দেখিয়া জুড়াল মোর তাপিত জীবন।
এমন মহাত্মা লোক কভু নাহি দেখি, আলাপে প্রবল ইচ্ছা তুমি জান নাকি।
পাহাড়ে জঙ্গলে আর যত তীর্থ ধামে, এমন পড়েনি কভু আমার নয়নে।
চুম্বকের আকর্ষণ ইস্পাত সচল, না শুনি উত্তর তিনি হইল বিহ্বল।
আস্তে আস্তে ব্রহ্মচারী হাঁটিতে লাগিল, দ্রুতপদে ঠাকুরের কাছেতে পৌঁছিল।
ঠাকুর হেরিয়া তাঁরে মৃদুমন্দ হাস, আলিঙ্গনে বাঁধে দোঁহে উভয়ের পাশ।
বহুক্ষণ রহিলেন এরূপ ভাবেতে, তারপর চলি গেল আপনার পথে।
অন্তরে অন্তরে তাঁহাদের মিলনেতে,
হইয়া গেল প্রেমালাপ উর্দ্ধের জগতে।
ব্রহ্মচারী ফিরে এসে বলেন তখন,
'প্রেমের ঠাকুর ইনি জান সর্বজন।'
একান্ত মনেতে পূজ ঠাকুর চরণ, অবশ্যই পূর্ণ হবে সব আকিঞ্চন।
এ মানুষ সামান্য নহে কহিলাম সার,
মানুষ আকারে কৃষ্ণ করেন বিহার।
যুগে যুগে সেই হরি নররূপ ধরি,
লীলা খেলা করে কত ভক্ত সঙ্গে করি। ভক্তগণ যাঁরা আছ যত নিজজন,
ঠাকুরের কাছে গিয়া জুড়াবে জীবন।
প্রেম-ভক্তি দিয়া জীব উদ্ধার কারণ, প্রেমের ঠাকুর এই অব্যক্ত লক্ষণ।
অতঃপর শুন সবে মনোযোগ দিয়া,
ব্রহ্মচারী তপস্বীর যে মহান হিয়া। অমৃত মাষ্টার ছিলেন মিশন স্কুলেতে,
ভক্তিমতী পত্নী তাঁর থাকিত সঙ্গেতে।
ব্রহ্মচারী কাছে দোঁহে দীক্ষা নিয়েছিল,
সদাচারে রত হয়ে প্রাণ সঁপেছিল। অমৃত বাবুর স্ত্রী'র ছিল মহাভক্তি,
ঠাকুরে ডাকিত দিয়া তার সর্ব শক্তি। পুরীধামে ছিল ব্রহ্মচারীর কুটির,
উৎসবে যাইত সবে হইতে সুস্থির। জপতপ আদি যত আহ্নিক পূজন,
করিতেন ভক্তগণ হয়ে হৃষ্টমন। ক্রমেতে যখন হ'ল অন্তিম সময়,
শ্রীগুরুর কাছে সবে কাতরে শুধায়। আপনি যাবেন বুঝি মোদের ছাড়িয়া,
কেমনে বাঁধিব হিয়া তোমা হারাইয়া। উত্তরে বলেন তিনি, 'ওহে ভক্তগণ,
বাশুড়িয়া ঠাকুরের লইও স্মরণ।' রাই রসরজ হ'ল প্রেমের ঠাকুর,
অবশ্য ভজিলে তাঁরে দুঃখ হবে দূর। এদিকে শুন সবে অদ্ভুত বারতা,
দরশনে যাহা দেখে বাবুর বনিতা।
ব্রহ্মচারী দেহ ত্যাগী সূদ্ধে দেখা দিয়া, বলেন তাঁহারে 'আমি যাইব চলিয়া।'
সময় হয়েছে মাতা আর না রহিব, রাই রসরাজ অঙ্গে অবশ্য মিশিব।
অদ্য আমি অপ্রকট হলাম পুরীতে, দশমন নুন দিল আমার সমাধিতে।
আমার বাক্যেতে কভু না কর অন্যথা, সময়েতে বার্তা পাবে এই শেষ কথা।
অমৃত বাবুর ভার্যা প্রভাত সময়, উপনীত হ'ল গিয়া পাঁচুড়িয়ালয়।
রাই রসরাজ কাছে কেঁদে কেঁদে কয়, 'ব্রহ্মচারী গুরু মোর মিশে আপনায়।'
সবিশেষ বলিলেন সকল বৃত্তান্ত, আশ্বাস দিলেন প্রভু শুনে আদ্যোপান্ত।
সকলের আত্মারূপে কৃষ্ণ অধিষ্ঠান, নিষ্কামের প্রেমভাব প্রভু শুধু চান।
ভক্তজন করে যদি বিষয় বাসনা, আত্মার কল্যাণ তাহে কভুতো হবে না।
বিষয়ীর নাহি থাকে কৃষ্ণ স্মৃতি জ্ঞান, সর্ব শাস্ত্রে এই কথা আছয়ে প্রমাণ।
কৃষ্ণ ভক্ত হয় যদি বিষয়ে আসক্ত, তাঁহার উদ্ধার লাভ হয় বড় শক্ত।
এই সেই কৃষ্ণচন্দ্র সেই গৌরহরি,
এবার আসেন প্রভু রাইরূপ ধরি। অধম অভক্ত জনে সাধ্য আছে কার?
সাধকেরা জানে মাত্র মহিমা তাঁহার। টেলিগ্রাম এল তার দুই দিন পরে,
ব্রহ্মচারী সমাধিস্থ পুরীর মাঝারে।
গোপালগঞ্জেতে ছিল যত ভক্তগণ,
সেই হতে ঠাকুরের লইল শরণ।
যজ্ঞেশ্বর চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ সন্তান, ঠাকুরের কাছে এসে গেল অভিমান। প্রবীন মোক্তার তাহে শাস্ত্রেতে অভিজ্ঞ,
সদাচারে রত সদা মান্য মহা বিজ্ঞ। আরো আরো বহু ভক্ত নৈষ্ঠিক সাধক,
ঠাকুরে গ্রহণ করে হইয়া চাতক। অমৃত বাবুর কথা বলা সাধ্যনয়,
ঠাকুর স্মরণে তাঁর অশ্রুধারা বয়। গিরীশ বাবুর গুণ সর্বলোকে কয়,
সত্যবাদি জিতেন্দ্রিয় করুণা হৃদয়। ব্রহ্মচারী শিষ্য যত সবে নিষ্ঠাবান,
ঠাকুরের কাছে এসে আরো ভক্তিমান। রাই রসরাজ লীলা অমৃত লহরী,
পাষণ্ড তরিয়া যায় বলে মুখে হরি।
পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন


0 Comments