ভক্তের অভিমান চূর্ণ লীলা

জয় জয় রাইচাঁদ তোমার সৃজন, স্থাবর জঙ্গম আর নদী গিরি বন।

স্বর্গ মর্ত্য পাতালেতে যত কিছু আছে, তোমার করুণা রাশি তাহে প্রকাশিছে।

তুমিই সবারে চিন তোমাকে কে চিনে,

উদ্ধার করিবে জীব কেবা তুমি বিনে? মনের গহন কোণে যাহা চাহিতেছে,

তুমি বিনা কেবা তাহা বুঝিতে পেরেছে। শুন শুন ভক্তগণ করি নিবেদন,

পুণ্যহীরা উপাখ্যান অপূর্ব ঘটন। বসতি তাঁহার ছিল খাটরার গাঁয়,

গোপালগঞ্জ শহরের উপর হয়।

পাচুরিয়া আশ্রমেতে ঠাকুর দেখিয়া, দেহ মন প্রাণ দিল পদেতে সঁপিয়া।

ভাবের সময় করে বম্ বম্ ধ্বনি, সকলে প্রশংসে তাঁরে দেখে ভাবখানি।

বাড়িনে ঠাকুর মূর্তি আসনের পরে, নিত্য নিত্য পূজা করে অতি ভক্তিভরে।

উৎসবে আসে যায় আনন্দিত মন, ঠাকুর চিন্তায় সদা থাকে নিমগন।

অভিমান মানুষের সহজে না যায়, তাহার বিষয় কিছু লিখিব হেথায়।

একদিন পাঁচুড়িয়া আশ্রমেতে আসি, ঠাকুর দর্শন করি হ'ল বড় খুশী।

কতলোক আসিয়াছে ঠাকুর দর্শনে,

সকলেই নিয়োজিত কর্মের বিধানে। পুণ্যহীরা মনে ভাবে তুমি দয়াময়,

আমাতে কার্যের ভার দেও এ সময়। ঠাকুর বলিছে, 'শুন হীরা মহাশয়,

পুকুরে কাটিছে মাটি যাও হে তথায়।' জল উঠিতেছে তাহা ফেলাইয়া দিবে,

'নচেৎ কাটিতে মাটি অসুবিধা হবে।'

ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম্য লোক আসিয়াছে কত, পুণ্যহীরা কাছে করে দরবার শত।

হীনাদেশে তার প্রতি হইল দুঃখিত,

রাগে গুমরিয়া তিনি হইলেন স্ফীত।

অপমান বোধ করি উঠি দাঁড়াইল, তখন বাড়িতে যাবে সঙ্কল্প করিল।

রাগ করি ঠাকুরের নিকটেতে কয়, 'এখন বাড়িতে যাব সেথা কাজ রয়।'

হাসিয়া ঠাকুর বলে, 'এখন হবে না, তোমাকে বাড়ি আমি যাইতে দিবনা।'

ক্রোধে কাঁপি পুণ্যহীরা বলে গর্ব ভরে, 'এখনি যাইব বাড়ি কে ঠেকাতে পারে।'

বিদায় লইয়া চলে গৃহ অভিমুখে, যথা পথ তথা গিয়া পড়িল বিপাকে।

আশ্রমের সীমানার বাহিরেতে গেলে, কিছুই দেখিতে নারে থাকে চোখ মেলে।

উত্তর দিকেতে পথ বন্ধ যে হইল, পূর্বদিক দিয়া যেতে চেষ্টা সে করিল।

সেদিকে গিয়াও তার দৃষ্টি শক্তি নাই, সীমানার মধ্যে কিন্তু নাহিক বালাই।

চতুর্দিকে এইরূপ চেষ্টা সে করিয়া, কাঁদিয়া পড়িল শেষে বিহ্বল হইয়া।

রাইপদ ধরি বলে, বৃথা অভিমান, তোমার উপরে করি সর্বশক্তিমান।

অধম বলিয়া মোর ক্ষম অপরাধ, তুমি বিনা কে পূরাবে মম মন সাধ।

সেই হতে হ'ল পুণ্য উন্মত্ত ভাবেতে, রাই ছাড়া কিছু আর না মানে জগতে।

যাহা কিছু ভাল দ্রব্য হলে তার বাড়ি, ঠাকুরের সেবায় দিত এনে তাড়াতাড়ি।

রাই রসরাজ রূপ দেখিয়া পাগল, জানিলে স্বরূপ তাঁর যাবে গণ্ডগোল।

কায়মনে ভজ সবে প্রভুর চরণ, জনম সার্থক হবে জুড়াবে জীবন।

রাই রসরাজ লীলা সুধার ভাণ্ডার, সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র এই পাপ খণ্ডাবার।

ভক্ত কমললাল পাণ্ডা উপাখ্যান

জয় জয় রাইচাঁদ ভক্তের জীবন, জয় জয় রসময় পতীত পাবন।

জয় জয় রসরাজ জীব উদ্ধারণ, জয় জয় ভক্তগণ যাঁহে জাগরণ।

কলিকাতা গিয়াছেন রাই দয়াময়, হাওড়া স্টেশনে তিনি হলেন উদয়।

কমল লালকে দেখি ডাকিয়া কহিছে, 'ভাইরে কমল লাল এস মোর কাছে।'

শুনি সে মধুর ডাক হইল বিস্মিত, নাম ধরে ডাকে মোরে কার হেন চিত?

ঠাকুরের কাছে আসি দাদা সম্বোধিয়া, আলিঙ্গনে সুশীতল করে তাঁর হিয়া।

ঠাকুর বলিছে, তুমি বাড়ি চলে যাও, যাত্রী পাৰেনা বেশী অযথা কেন রও?

কমল বলিছে দাদা মোর সঙ্গে চল, গয়াধামে যাবে কিনা তাহা মোরে বল?

ঠাকুর বলিছে, 'আমি কাশীধামে যাব, গয়াধামে পথি মধ্যে কি আর বলিব?'

অবশেষে কয়জন একত্রিত হইয়া, সবে মিলি এক ঠাঁই রহিল বসিয়া।

গাড়ীতে উঠিলে শেষে চেকার আসিল, পনরখানা টিকিট তার হাতে দিল।

চেকার চলিয়া গেল টিকিট দেখিয়া, সন্দেহ দোলায় দোলে কমলের হিয়া।

টিকিট না করে দাদা আমি দেখিয়াছি,

জিজ্ঞাসিছে, 'কহ দাদা একি মিছামিছি?' ঠাকুর বলিছে, 'শুন মোর দোষ নাই,

যার কর্ম সেই করে জানো তাই ভাই।'

ঠাকুর চলিয়া গেল গয়াতে যখন, অবস্থান করিলেন কমল ভবন।

স্বামী-পত্নী দুইজনে রাখে সযতনে, সুখেতে কাটিল নিশি প্রেম আস্বাদনে।

পরদিন প্রাতঃকালে ঠাকুর জাগিয়া, বলিতেছে কমলকে গোপনে ডাকিয়া। বছরের পরে তুমি লক্ষ্মীছাড়া হবে,

এই কথা তুমি আজ সত্য মানি লবে। কমল লিখিয়া রাখে সে দিন তারিখ,

বৎসর পূর্ণ যবে দেখে কথা ঠিক। তথা হতে রাইচাঁদ কাশীধামে যায়,

ঠাকুরে রাম জীবন রয়েছে তথায়। ঠাকুরের প্রিয় ভক্ত সেইজন ছিল,

নিঃস্ব বটে তবু ছিল বড় উচ্চ দিল। অন্য এক সন প্রভু যান গয়াধামে,

 কমল আনন্দ পায় অতীব মরমে। পঁচাত্তর জন লোক প্রভু সঙ্গে ছিল,

কমলের ভবনেতে আশ্রয় লইল। আনন্দেতে মহোৎসব সেখানেতে হয়,

ভক্তগণ অনেকেই চিন্তান্বিত রয়। ঠাকুর বলিছে, 'আমি যাব বৃন্দাবন,

তাহা শুনি অনেকের সজল নয়ন।' যাহাদের নিকটেতে টাকা কড়ি নাই,

কিরূপে যাইব সঙ্গে ভাবিতেছে তাই। অনেকেই কাঁদিতেছে 'হা রাই' বলিয়া,

আমাদের প্রভু তুমি না যাও ফেলিয়া। ঠাকুর বলেন, 'শুন আমার বচন,

বৃন্দাবনে যেতে কারো না লাগিবে ধন।' গাড়ী ভাড়া যতকিছু দিব এই পণ,

মোর সঙ্গে বৃন্দাবনে যাবে যতজন। বিস্ময়ে কমল বলে, 'এত টাকা দিবে?'

ঠাকুর বলেন, 'কেন এ প্রশ্ন উঠিবে?' যাঁহার উদ্দেশ্যে যাব তিনি সব দিবে,

আমি মাত্র উপলক্ষ তাহাতে রহিবে।

স্টেশনেতে তৎপর সকলেই গিয়া, না করি টিকিট সবে রহিল বসিয়া।

গাড়ী চড়িবার কালে টিকিট চাহিল, 'আমি দিব ছেড়ে দাও' ঠাকুর বলিল।

অবশেষে লোক হ'ল ছিয়াত্তর জন, সমস্ত টিকিট গণি দিল ততক্ষণ।

কমল ভাবিল মনে কুহক হইবে, অন্যমনে ভাবিতেছে ইহা কি সম্ভবে।

বৃন্দাবনে গিয়া সবে উপনীত হ'ল, বিশ্রাম করিতে এক মন্দিরে বসিল।

নূতন মন্দির সেই অসমাপ্ত আছে, তাহার ভিতর সবে আরামে বসিছে।

শ্রীকৃষ্ণ মূরতি আছে মন্দিরের গাঁয়ে, সকলেই তাঁর দিকে রহিয়াছে চেয়ে।

কমল চাহিয়া আছে নিরীখ ধরিয়া, ভাবিতেছে কত কথা শ্রীকৃষ্ণ স্মরিয়া।

কত যুগ যুগান্তর হয়ে গেছে পার, হেথা হতো লীলা খেলা যুগেতে দ্বাপর।

খেলেছিল লীলাচ্ছলে না যায় বর্ণন, প্রেমে আত্মহারা হ'ল গোপগোপীগণ।

অনাদি অনন্ত তুমি জীবের কারণ, এসেছিলে নররূপে তারিতে ভুবন।

তোমার মহিমা প্রভু কিছুই না জানি, নিজগুণে দাও প্রভু চরণ দু'খানি।

সর্বকাল থাক তুমি এই বৃন্দাবন, দেখা দিয়ে স্নিগ্ধ কর তাপিত জীবন। কাঁদিতেছে ঝরিতেছে পড়িতেছে জল, অশ্রুজলে ধৌত হ'ল হৃদয় কমল। ঠাকুরের কাছে বসি কাঁদিছে যখন, মাঝে মাঝে মূর্তি দিকে করে নিরীক্ষণ।

শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি স্থলে রাইরূপ হেরি, রাই স্থানে স্বয়ং কৃষ্ণ উঠিল শ্রীহরি।

মূর্ছিত হইয়া পড়ে চরণে তখন, শুশ্রুষা করিল তাঁরে অন্য ভক্তগণ। কিছুক্ষণ পরে যবে চেতনা পাইল,

ঠাকুর তখন তাঁকে বলিতে লাগিল। কারো কোনো ভাগ্যক্রমে দর্শন হইলে, ভাল নয় তখনেতে প্রকাশ করিলে। এইরূপ বহু বহু প্রমাণ পাইয়া, মনের মানুষ রাই লইল চিনিয়া।

বৃন্দাবন ছাড়ি শেষে বাশুড়িয়া আসে, প্রেমে পুলকিত তনু জীবে ভালবেসে। অন্তরে প্রকাশে যাঁর প্রেমের অঙ্কুর,

সাধনায় পায় সেই প্রেমের ঠাকুর। শ্বেতবর্ণের পাথর আর শ্বেত গ্লাস, ঠাকুর সেবায় দিয়া মনেতে উল্লাস। অবশেষে ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে আসে,

বাশুড়িয়া আশ্রমেতে ভাবের আবেশে। এরপর ঠাকুরের কাছে ইহা বলে,

'তব ভক্তগণ সব গয়াধামে গেলে। অর্থ নাহি লব আমি এই কথা র'ল,

তবেই পাইব আমি পারের সম্বল।' ঠাকুর বলেন তাঁরে উহা না করিবে,

এক টাকা মাত্র তুমি তথায় লইবে। মাথা পাতি মেনে লয় প্রভুর নির্দেশ,

শুদ্ধ শান্ত কমলের কথা হ'ল শেষ। রাই প্রীতি সবে মিলি দেহ হরিধ্বনি,

 রাই বিনা আন কথা যেন নাহি শুনি। রাই রসরাজ লীলা অমৃত সমান, ভক্তিভাবে শুনে যাঁরা তাঁরা পুণ্যবান।


পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন