শ্রীশ্রীজগদীশ গোসাঁই উপাখ্যান


জয় জয় রাইচাঁদ সর্ব শক্তিমান, প্রেমের ঠাকুর তুমি করুণা নিদান।

পৃথিবীতে এলে তুমি নররূপ ধরি, খেলিতে আসিলে তুমি গোলক বিহারী।

আদি অন্ত নাহি কিছু লীলায় তোমার, জীবে কি বুঝিবে যাহা দেবে বোঝা ভার।

ভুবন মোহন তুমি সোনার বরণ, রূপেতে জিনিলে তুমি মদন মোহন।

মোহন মূরতি তব করি নিরীক্ষণ, কত নর-নারী দিল কুল বিসর্জন

মুখচন্দ্র বস্ত্রাবৃত করিয়া রাখিতে, সহজে না পায় যাহে সেরূপ দেখিতে।

তোমার মূরতি হেরি কামিনীর কুল, জাতিকুলে কালি দিয়া কাঁদিয়া আকুল।

কিবা সে মোহনী শক্তি স্বরূপের মূল, জাগতিক ভাব সব করে দিল ভুল।

অসতর্কে হেরি তব বদন কমল, অজানিত ভাবে আসে নয়নের জল।

সৌন্দর্যে হইয়া মুগ্ধ কতশত জন, দিশেহারা হয়ে পিছে করেছে গমন।

কত যে সুন্দর তুমি আনন্দের খনি, পরাণ জুড়ান ধন নয়নের মণি।

অন্তরের অন্তস্তলে কিবা কি রয়েছে,

অজ্ঞান ভাবেতে তাহা বিদিত হয়েছে।

কেন্দুয়া গ্রামে ছিল জগদীশ গোসাঁই,

বিখ্যাত সাধক তিনি সবাকে জানাই।

চরণ কমলে তাঁর করি প্রণিপাত, কৃষ্ণ ভক্তি রাই প্রীতি যাহে রেখাপাত। একদা আসেন তিনি পান্সী নৌকায়, নৌকাতে উঠিয়া ভক্তে নানা কথা কয়।

হাল ধরিয়াছে যেবা বলে 'গরু চোর, পান্সীতে হাল ধরিস এত সাহস তোর।'

কতজনে কত নিন্দা করিতে লাগিল, বিড়াল মারিলি কেন? কাহাকে বলিল।

ঠাকুর বলিছে, 'ভাই ও বলিতে নাই, প্রাণেতে তাঁদের এবে সাধু সঙ্গ চাই।'

ভুলিয়া গিয়াছ কি মহাপ্রভুর বাণী, যাহাকে লয়েছে সবে সার সত্য মানি।

সাধু সঙ্গ সাধু সঙ্গ সর্ব শাস্ত্রে কয়, লবমাত্র সাধু সঙ্গে সর্ব সিদ্ধি হয়।

সকলের দোষ যদি এবে তুমি ধর, কেহ আর না থাকিবে নৌকার উপর।

তুমি ধর দাঁড় আর আমি হাল ধরি, এরূপ ভাবেতে মোরা নৌকা বেয়ে মরি। গোসাঁই বলিত দাদা প্রভুকে তখন,

ঠাকুরের কথা শুনি ঝরিল নয়ন। একদা গোসাঁই এসে নারিকেল বাড়ি,

গোলক ও মাহানন্দ পাগলের বাড়ি। বাশুড়িয়া ঠাকুরের ভক্ত আটজন,

 গোসাঁয়ের স্থানে তাঁরা করিল গমন। বিখ্যাত পুলিন ভক্ত ছিল তার সাথে,

তাঁরে আদেশিল গোসাঁই নাম গাহিতে। নামেতে হইল বড় আনন্দ উদয়,

প্রেমানন্দে গড়াগড়ি সেইখানে হয়। গোসাঁই আকুল হ'ল কাঁদিয়া কাঁদিয়া,

'ছাড়িয়া গিয়াছে দাদা অভাগা বলিয়া।'

সুন্দর ফুলের মালা গলে গোসাঁয়ের, বের করি গলে দেয় ভক্ত সুরেনের।

ভাবের বিহ্বল তিনি কথা নাহি কয়, এইরূপে বলে তিনি অনেক সময়।

রাইচাঁদ ভক্ত গুণ বলিতে লাগিল, গৌরাঙ্গের অবতারে কেবা কিযে ছিল।

বহুগৃহে ভোগ হয় গোসাঁই সেবায়, এক ঘরে পিড়ি দেয় বসিতে তথায়।

একাকী বসিবে তিনি একখানি পিড়ি, তাহা দেখি গোসাঁয়ের ক্রোধ হ'ল ভারী।

দাদার যে ভক্তবৃন্দ তাঁদের ছাড়িয়া, একাকী বসিব আমি কেমন করিয়া।

নৌকায় উঠিয়া তিনি রওনা করিল, একজন ঝাপাইয়া নৌকাটি ধরিল।

সেই ঘরে পিড়ি দেয় আর আটখান, ঠাকুরের ভক্ত ডাকি আনে ততক্ষণ।

প্রেমানন্দে সবে মিলি খাইতে লাগিল, গোসাঁই প্রসাদ দানে সবারে তুষিল।

ভোজনের পর সবে সে স্থান হইতে, পৃথক পৃথক চলে যার যার পথে।

অন্য একদিন আসে সাতপাড় গাঁয়, বহু লোক উপস্থিত হইল তথায়।

সাধুদের আলোচনা করিতেছে তিনি,

কার কিবা ব্যবহার কি কার্যেতে গুণী। বহু বহু সাধুদের আলোচনা হ'ল,

একজন বলে, প্রভু বাকী কিছু র'ল।

বাশুড়িয়া ঠাকুরের কথা নাহি কও,

সেই ঠাকুরের গুণ আমাদের জানাও।

গোসাঁই বলিছে, 'আমি বলিতে পারি না,

গৌরাঙ্গের আলোচনা মো হতে হবে না।'

সাধুদের কথা কিছু বলিবারে পারি, শ্রীহরির কথা কিছু বলিতে যে নারি।

অনেকে আক্ষেপ করি বলিছে তখন, প্রকট থাকিতে ইহা না বলা কারণ? গোসাঁই বলে, 'তিনি সকল কারণ,

ইচ্ছাময় প্রভু সেই মোরা অকারণ।' গোসাঁই আশ্রম করে ফুকরা গ্রামেতে,

বহু অলৌকিক লীলা করে সেখানেতে। হরি লীলামৃতে আছে জম্বুরা কাহিনী,

পড়িলে বুঝিবে কত সিদ্ধ যোগী তিনি। বহু বহু লোক গাথা আছয়ে প্রচার,

কোটিতে গুটিক আছে সমান তাঁহার। গোসাঁই ভুগিছে জ্বরে ভক্তকে পাঠায়,

'দাদার নিকটে গিয়া তোরা জেনে আয়।' রাইচাঁদ পাঁচুড়িয়া ছিলেন তখন,

দৈনিক আসিতেছে তথায় ভক্তগণ। গোসাঁয়ের ভক্তগণ আসে আর যায়,

বলিয়া তাদের কিছু যেন সারে দায়। একদিন এক ভক্ত আসিয়া কহিছে,

গোসাঁয়ের শেষ কথা বলে যাহা দিছে। ঠাকুর ডাকিয়া কয় সতীশে তখন,

কমলা খাইতে ভাই করেছে মনন।

আনহ বাছিয়া লেবু সবচেয়ে সেরা,

ভক্ত হাতে পাঠাইয়া দিব সেথা ত্বরা।

লেবু তার হাতে দিয়া বলিছে বচন, সম্পূর্ণ লেবুটি যেন করেন ভক্ষণ।

ছোবড়া ও আটিগুলি কিছু বাদ নাই,

এই খেলে জ্বর যাবে বলিলাম তাই।

সেই হতে গোসাঁয়ের জ্বর সেরে গেল,

পাঁচুড়িয়া কিছু জমি দানেতে পাইল।
ভক্তেরা কহিল, 'কর এখানে আশ্রম, সেখানে সকলে আসি লভিব আরাম।' কয়েক বছর চলে সেরূপ ভাবেতে, ইট কাটিলেন আরো আশ্রম গড়িতে।

বহুদিন এইভাবে চলিবার পর, গোসাঁই বলেন, 'এর কিবা দরকার?' ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত আশ্রম রয়েছে, নূতন আশ্রম গড়া প্রয়োজন মিছে।

ইট কাঠ যাহা ছিল তাহা লইয়া যায়, কেন্দুয়া আশ্রমে তাহা সকল পৌঁছায়।

মহাপুরুষের লীলা বুঝা নাহি যায়, কত যে অদ্ভুত খেলা খেলিয়া বেড়ায়।

রাই রসরাজ লীলা অতি চমৎকার, শুনিলে কাটিয়া যায় সকল বিকার।


পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন