ভক্ত সন্ধান লীলা

জয় জয় রাইচাঁদ ভব ভয় হারি, মানুষের সাজে লীলা যাই বলি হারি।

জয় জয় ভক্তগণ মহিমা অপার, মানুষে বুঝিবে কিবা দেবে বোঝা ভার।

গরীবের গৃহে জন্ম করিলে গ্রহণ, নরের প্রকৃতি কর্মে রত অনুক্ষণ।



ফাঁকি কভু নাহি দেয় নিজে ঠকে ভাল, সদানন্দে রহে প্রভু মুখ নহে কাল।

সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় সরল স্বভাব, দেখিয়া যায়না বোঝা আছে কি অভাব?


মাঝে মাঝে ভাবে মত্ত হয় উদাসীন, সাধারণে ভাবে তাঁর কষ্টে কাটে দিন।


রসিক ভাবুক যাঁরা তাঁরা দেখে বোঝে, ৯৭ দীনতা হীনতা নয় আছে ভক্ত খোঁজে।


একবার রাইচাঁদ জমি নিড়াইতে, কাঠাদুরা গিয়াছিল প্রিয়র বাড়িতে।

পিতা-মাতা হরিভক্ত অসীম সে গুণ, দিবানিশি মুখে সদা হরি গুণাগুণ।


একাকী ঠাকুর গেল তাঁর জমি মাঝে, সেথা গিয়া রত হ'ল নিড়ানোর কাজে।


বৃদ্ধ গেল দেখিবারে একা কিবা করে, দূর থেকে দেখে তাঁর আনন্দ না ধরে।


সহস্র সহস্র ভক্ত নর্তন করিছে, তার মাঝে রাইচাঁদ দাঁড়াইয়া আছে।


ত্রিভঙ্গ বঙ্কিম ঠামে দু'বাহু তুলিয়া, মৃদু মন্দ হাসিতেছে রাধা বিনোদিয়া।

আনন্দে করিছে নৃত্য বৃদ্ধ মহামতি, নিজগুণে প্রভু তাঁরে দেখাল স্বমূর্তি। সেখানে পৌঁছিয়া বৃদ্ধ বলিছে তখন, "জমিতেনা কার্য কর কিসের কারণ?"

ধান চারা মাটি সনে মিশিয়া গিয়াছে, অশ্রুজলে ভাসি সাধু সব দেখিয়াছে।

তবু বলে, "ওকি খেলা খেল বাছাধন? উহারা তোমার সনে জুটিল কখন?"

কিছু না বলিয়ে প্রভু রহে আধো মুখে, তাহা দেখি বৃদ্ধ বলে হাসিয়া কৌতুকে।

"দেখিয়াছি মূর্তি তব নর্ম সখা সনে, ভুলাতে নারিবে আর লইয়াছি চিনে।" ভাব সংবরণ করি লাগিল নিড়াতে, "কিছু নয়" বলি প্রভু লাগিল হাসিতে।

দেবতা গন্ধর্বগণ করি আগমন,

করিয়াছে রাইচাঁদে কীর্তনে অর্চন।

বৃদ্ধ যবে হেঁটে গেল সেই লীলাস্থান, ভোজবাজী সম হ'ল সবে অন্তর্ধান। তারপর গেল বৃদ্ধ ঠাকুরের কাছে, ঠাকুর আসিয়া তাঁরে প্রণাম করিছে।

বৃদ্ধ বলে, 'ওরে বাপু নাহি দিও সেবা, জানিয়াছি রাইরূপে তুমি এলে কেবা।

শিহরিয়া ওঠে অঙ্গ তব নমস্কারে, তোমার ভিতরে যেন কিবা শক্তি ধরে। বিরাজিত তব মাঝে প্রভু ভগবান, এইজন্য কেঁদে ওঠে মম শুষ্ক প্রাণ। সেইহেতু বাবা মোর এই নিবেদন, কোনদিন করো নাকো আবার এমন।

"প্রণামের যোগ্য তুমি আমি দুরাচার, কৃপা করে বাবা মোরে করহ উদ্ধার।"
ভক্তের সম্মুখে লীলা করে রাইচাঁদ, জগতের জীব ধরে পাতি প্রেম ফাঁদ।

বিচিত্র এ নরলীলা বোঝে কোন জন?

সে বোঝে যারে বোঝায় নিজে নারায়ণ।

এইরূপ কত শত লীলা খেলা হয়, কত আর দেয়া যায় তাঁর পরিচয়।


জানিয়া শুনিয়া কত শত ভক্তগণ, ভুলিয়া রয়েছে পেয়ে নশ্বর রতন।

এমন সুদিন পেয়ে যদি ভুলে যাই, রাইরূপে পেয়ে সেই ত্রিভঙ্গ কানাই।

বৃথা কাজে যায় যদি দুর্লভ জনম, প্রেমের ঠাকুর পেয়ে না বুঝে মরম।

কোনদিন কোন জন্মে দুর্গতি না যাবে, মানব জনম তার বিফল হইবে।

রাই ভজ রাই চিন্ত রাই কর সার, ভব সিন্ধু পারি দিতে বন্ধু নাহি আর।

রসরাজ লীলামৃত বড়ই মধুর, আস্বাদনে মতি যার সে বড় চতুর।



ভাবাবেশে প্রভু

জয় জয় রাইচাঁদ সর্ব সিদ্ধিদাতা, তুমি বিষ্ণু তুমি শিব তুমিই বিধাতা।

সর্ব স্রষ্টা তুমি প্রভু আসি বিশ্ব মাঝে, ভক্ত সঙ্গে কর খেলা মানুষের সাজে।

জয় জয় ভক্তগণ দাস্য-সখ্য-শান্ত, বাৎসল্য মাধুর্য স্থিতি তব পদপ্রান্ত।

যখন যেমতি ইচ্ছা তেমতি খেলাও, কে বোঝে তোমার লীলা যদি না বোঝাও।
আদান বালার পুত্র গণেশ চরণ, সেনেশ্চর গ্রাম মধ্যে তাঁহার ভবন।


সমসাথী যতজন সংসারেতে হয়, আপন বোধেতে তারা পরস্পর কয়।

যবে যাহা মনে আসে বলে সেই কথা, সমব্যথী নাহি হলে কে বুঝিবে ব্যথা।

সখা সম ব্যবহারে তোষে বন্ধুগণে, এই কথা জানা যায় করি আলাপনে।

গণেশের জমি মাঝে কলাই বুনিছে, পক্কতায় কাটিবার সময় হয়েছে।

কৃষাণ চাহিল আসি ঠাকুরের কাছে, গণেশের আসাহেতু প্রভু বুঝিয়াছে।


কলাই কাটিতে কর্তা প্রস্তুত হইল, ধারাল কাঁচির দ্বারা কাটিতে লাগিল।

ভাবেতে বিভোর থাকি কাটিছে কলাই, অল্পক্ষণ পরে এক ঘটিল বালাই।

আঙ্গুল কাটিয়া গেল লাগিল হাড়েতে, রক্ত নাহি বন্ধ হয় যাহা দেয় হাতে।


বহু রক্তপাত হয় বাম হাত কাটে, গণেশ বলিছে, "ইহা কিজন্য বা ঘটে?" ঠাকুর বলিছে, "মন কলায়ে না ছিল, বহুদেশ দেশান্তর ভ্রমণ করিল।"


দেহ বটে ছিল হেথা মন নাহি ছিল, অপূর্ব জগতে থাকি আনন্দে মাতিল।

কেটে গেল হাত মোর অনুভব নাই, অবিরত রক্ত পড়ে বেদনা না পাই।

প্রভুর বহুত লীলা এইরূপ ছিল, তাহার বর্ণনা দিতে কেবা আছে বল।

দিশেহারা ভাবাপন্ন আত্ম স্মৃতি নাই, জগতে তুলনা তাঁর নদের নিমাই।

অপূর্ব মানুষ রাই অপূর্ব তাঁর কর্ম, শোনে নাই এ জগতে এইরূপ ধর্ম।

শুদ্ধ প্রেম ভক্তি মাত্র চাহিতেন তিনি, শ্রীকৃষ্ণ প্রেমের মূর্ত প্রতীক যে মানি।

ত্যাগের মহিমা শুধু যাহা দেখায়েছে, শাস্ত্র গ্রন্থ খুঁজি তাহা নাহি মিলিয়াছে।

সখ্যভাবে তাঁর লীলা সাথীগণ সনে, কৃপা ভিন্ন সেই লীলা বুঝিবে কোন জনে?

এইরূপ লীলা খেলা করে ভগবান, যাঁহাদের সনে করে তাঁরা ভাগ্যবান।

শয়নে স্বপনে যেবা করে ধ্যান, বুঝিবে আপন মনে বাড়িয়াছে জ্ঞান।

রাই রসরাজ লীলা শুনে যেইজন, কোটি কল্প জনমের হইবে সাধন।

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন