বিবাহ লীলা
জয় জয় রাইচাঁদ বিশ্ব বিমোহন, মোহিত করিলে তুমি এ ত্রিভুবন।
ঈশ্বর পিপাসু ভবে যারা রহিয়াছে, তোমাকে নেহারি তারা সব হারায়েছে। তার্কিক পাষণ্ডগণে কভু নাহি চিনে, প্রেমের ঠাকুর তুমি জানে ভক্তগণে। জীবগণে বিলায়েছ প্রেম ভক্তিধন, জয় জয় রসরাজ জয় ভক্তগণ।
প্রভুর বিবাহ কথা শুন সর্বজন, লোকাচারে হ'ল যেই অদ্ভুত ঘটন।
যিনি আদি তিনি অন্ত কারণের মূল, লীলাময় লীলা করে ভাঙ্গিবারে ভুল
বিবাহ করিতে ইচ্ছা না ছিল তাঁহার, কর্মে আর ধর্মে মাত্র শুদ্ধ ব্যবহার।
সাথীদের সাথে যবে আলাপ করিত, "প্রয়োজন নাহি বিয়া" ঠাকুর বলিত।
দু'দিনের জন্য আসা এই পৃথিবীতে, উদ্দেশ্য আমার মাত্র শ্রীকৃষ্ণ ভজিতে।
মায়াতে মোহিত করে রাখেন সংসার, না বুঝালে তাঁর লীলা কে বুঝিবে আর।
যাঁর ইচ্ছা ব্যতীরেকে কিছু নাহি হয়, ভাবিছেন ভবিতব্যে কি করি উপায়?
হরিচাঁদের ভক্ত গোলক মহানন্দ, ইচ্ছিল বিবাহ দিতে লভিতে আনন্দ।
অন্তর্যামী প্রভু যবে জানিলেন তাহা, ভক্তিভাবে শুন সবে অতঃপর যাহা।
বাহিরেতে ভক্তি আর হৃদে ভালবাসা, প্রাণাধিক ভক্তদ্বয়ে পূরাইতে আশা।
"তথাস্তু বলিয়াও মনে করেন ছল, দেখাইতে জগতেরে ভক্ত মনোবল।
চিরঞ্জয়ী ভক্তগণ হারে ভগবান, ছল করি লীলা করে বাড়াইতে মান।
ভগবান আছে বাঁধা যাঁর প্রেমডোরে, যেদিকে ঘুরায় তাঁরে সেই দিকে ঘোরে।
শাস্ত্রেতে আছে যার বহুত প্রমাণ, বাহুল্য বিধায় করি হেথা প্রত্যাখ্যান।
পাগলেরা জানে রাই বড়ই চতুর, তবুও বাসনা হেরে মিলন মধুর।
"বাবা হরিচাঁদ” বলি দিল তাঁরা হাক, মানরাখা তাঁর দায় বিশ্ববাসী দ্যাখ।
ঠাকুরেরা দুই ভাই সখি আর রাই, তাঁহাদের সৌভ্রাত্রের তুলনা যে নাই।
বিবাহের উপযুক্ত হ'ল জ্যেষ্ঠ সখি, কন্যা ঠিক করিলেন সুলক্ষণা দেখি।
বরিশাল জেলা মাঝে আছে লড়া গ্রাম, ঈশ্বর নগণ্ডা তথি বড় গুণগ্রাম।
তাঁর কন্যা সঙ্গে করি সম্বন্ধ স্থাপন, শুভদিনে বিবাহের কৈল আয়োজন।
বাশুড়িয়া হতে যাবে সখিচাঁদে লইয়া, ঈশ্বর নগণ্ডা দিবে তাঁর কন্যা বিয়া।
ঠাকুর সঙ্গেতে ছিল হঠাৎ লুকালো, কারণ না জানি সবে ভাবিতে লাগিল।
রহস্য অবশ্য আছে অতিশয় গূঢ়, মিছামিছি বাজে চিন্তা করে যারা মূঢ়।
যে ইচ্ছা তাঁহার মনে পূর্ণ হবে তাহা, নিমিত্তের ভাগী মাত্র মরি কিবা আহা।
হেনকালে দেখ এক দৈবের ঘটন, গোলক ও মহানন্দ দিল দরশন।
তাহারা ছিলেন দোঁহে ঈশ্বরের গুরু, ঈশ্বরে ডাকিয়া বলে, "ওরে বেটা গরু।"
কন্যা দিস যাঁরে তাঁরে আছে ছোট ভাই, তাঁরে মেয়ে দান কর যাঁর নাম রাই।
সেই কথা ঈশ্বর চিন্তি ভাল মতে,
দুই কন্যা দান ইচ্ছা দু'ভাইয়ের হাতে।
লুকাবার কারণ হ'ল বিয়ার কথা, যা হোক খুঁজিয়া আনে লিখন বিধাতা।
মানুষের স্বভাবেতে আপনাকে ঘিরে,
থাকেন সতত প্রভু দৃষ্টি অগোচরে। ভক্তেরে ফাঁকি দেওয়া এত কি সহজ?
মহানন্দ গোলকের তাইতো গরজ। ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণহেতু প্রভু পরিণয়,
নহিলে কি তাঁর ইচ্ছা অনুরূপ হয়।
বিবাহ করিয়া প্রভু দেখালো জগতে, গার্হস্থ্যে থাকা যায় কেমনে ধর্ম পথে।
বিশ্বপতি বিশ্বে আছে মানুষে মিশিয়ে, খুঁজিয়া তাঁহারে ধর মন প্রাণ দিয়ে।
শুদ্ধ শান্ত হয়ে যদি পার ধরিবারে, ভক্তিতে শ্রীকৃষ্ণ প্রাপ্তি হইবে সংসারে।
জপতপ ধ্যান জ্ঞান আর যত বিধি, সকলের কাম্য প্রাপ্তি শ্যাম গুণনিধি।
যদি কেহ পায় সেই পরম রতনে, মনের মানুষসহ রহে রাত্রি-দিনে।
মানুষের সাথে যেবা ধূলি খেলা করে, তাঁহাকে বলিতে কর্তা বাঁধে যে অন্তরে।
এইমত মোহে ঘিরি ভক্তের সমাজ, বিমুগ্ধ করিয়া লীলা করে রসরাজ।
রসরাজ বিন্দুপ্রিয়া মিলন মধুর, শুনিয়া ভক্তেরা পাবে আনন্দ প্রচুর।
রসরাজ লীলামৃত যে করে শ্রবণ, অনায়াসে পাবে সেই যুগল চরণ।
বিভূতি প্রকাশ লীলা
মায়া মোহ অন্ধকার করিবারে নাশ, অবতরি প্রকাশিতে তব অভিলাষ।
পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদে ডাকি পিতা-মাতা, পুনরায় আনে তোমা ভক্তের বিধাতা।
জয় জয় হরিভক্ত রাই ভক্তগণ, মতুয়ার মাঝে হোক প্রীতি সম্মিলন।
হরিনামে সদা মত্ত সাথীদের সনে, কৃষি কাজ করে প্রভু আনন্দিত মনে।
গাতা বাঁধি কাজ করে হৃদয়ে উল্লাস, কাহাকেও ফাঁকি দেয়া ছিল না অভ্যাস।
অপরের ভূয়ে গিয়া করেনি বিশ্রাম, সকলে জিরায় কর্মে লিপ্ত অবিরাম।
খাটুনি থাকিলে কম হবে না আরাম, গর্ভের যন্ত্রনা ভোগে না পাবে বিরাম।
ফিরিয়া আসিতে হবে এই পৃথিবীতে, যেখানেতে ভোগে নর ত্রিতাপ জ্বালাতে
প্রয়োজন নাহি তাঁর শিক্ষা দিতে জীবে, সদা কর্মে লিপ্ত প্রভু আসি এই ভবে।
অনুসরি মোরে তারা করুক সাধন, যাহাতে কাটিবে এই ভবের বাঁধন।
মতুয়ার দল লয়ে যেত ওড়াকান্দি, দেখিয়া সবাই বলে জানে বড় সন্ধি।
তাঁহার দলের মত আর ছিল কার? নর্তনে কীর্তনে ছিল অতি চমৎকার।
একবার বারুণীতে দল লয়ে গেলে, গুরুচাঁদ ডাকিল, "রাই পাগল" বলে।
"দল মারানির বেটা আর আসিস্ না, এত যদি ইচ্ছা থাকে বাড়ি করগে যা।"
এতেক শুনিয়া প্রভু বলে গুরুচাঁদে, "দল লইয়া আসিবনা আর বারুণীতে।
আপনার আশীর্বাদ মাথে করি লই,
পাগলামী থুয়ে আজ সেই রাই হই।" "তথাস্তু” বলিয়া গুরুচাঁদ তাঁরে কয়, "আজ থেকে কেটে গেল যা ছিল সংশয়।"
রাগারাগি রেষারেষী নাহি যেন কর, বয়সে নবীন বটে মনে রেখ বড়।
সাষ্টাঙ্গে প্রণামী যবে প্রভু যাত্রা করে, অমনি শ্রীগুরুচাঁদ জড়াইয়া ধরে।
বলে, "বাবা হরিচাঁদ রাইরূপে এলি, কিসের লাগিয়া মোরে মর্যাদা করিলি? এ ভার সহিতে কি মোর সামর্থ আছে? স্নেহের প্রতিদানে ভোগতে চাও পিছে।
প্রভু বলে, "গুরুচাঁদ প্রকাশ করোনা, মায়িক জগতে এরা ভাবতো বোঝেনা।
যাদের সঙ্গ করি থাকি তাদের লয়ে, নবরূপে নবভাব যাইব খেলিয়ে।
তোমার আমার সাথে আছে যে সম্বন্ধ, তাহা কি মুছিতে পারে হয়েছো কি অন্ধ?
এতবলি লোকাচারে বন্দি চলি যায়, হাহাকার করি কাঁদে ভক্তেরা সবায়।
বিভূতি প্রকাশ লীলা বুঝিবে সাধকে, পেচক সদৃশ যারা পড়িবে কুহকে।
রাই রসরাজ লীলা মন মুগ্ধকর, সুধীজনে বলে ইহা সুধার আকর।
যেইজন পড়ে কিম্বা যেইজন শোনে,
ভব নদী পার হবে সুখে সন্তরণে।
পূর্ণব্রহ্ম স্বরূপ লীলা
জয় জয় রাইচাঁদ
ভুবনে পাতিল ফাঁদ
নররূপে হলে অবতার।
নামে প্রেমে মাতাইয়া
ভক্তগণে কাঁদাইয়া
হাতে দিলে ভোগ্য দেবতার।।
তবুও না চিনে তোমা
মনে করে রামাশ্যামা
যত আছে বহিরঙ্গগণ।
যাঁরা হয় অন্তরঙ্গ তাঁরা করে তব সঙ্গ প্রেমেতে বিভোর সর্বক্ষণ।।
বাশুড়িয়া হতে আসি পাঁচুড়িয়া হলে বাসী ভক্তেরা ভাবয়ে বৃন্দাবন।
এখানের লীলা খেলা মম পিতৃদেব বলা সংক্ষেপেতে হইল বর্ণন।।
একদিন ভোর বেলা হইল ভক্তের মেলা প্রভুপাদ বৈসে মধ্যমণি।
ধর্ম কথা আলোচনা যাতে হয় পূজার্চনা দিতেছেন সেই মহাবাণী।।
ছিল সেথা ভক্তগণ অন্তরঙ্গ নিজজন আর ছিলেন দয়াল বসু।
যদ্যপি খ্রীষ্টান তিনি তাঁরে ধর্ম প্রাণ জানি আরম্ভিল উপাখ্যান যিশু।।
শুনিয়া সে কাহিনী উচ্চৈঃস্বরে করি ধ্বনি বলেন ঠাকুরে পরিত্রাতা।
কথা ছিল ফিরে আসা দিতে জীবে ভালবাসা তাইতো আসিলে প্রেমদাতা।।
এত বলি উভরায় কান্দি গড়াগড়ি যায় ধরি প্রভু শ্রীপদ যুগলে।
ঠাকুর জড়ায়ে ধরে কত কি প্রবোধে তাঁরে তবু তাঁর ক্রন্দন উথলে।।
ভাবাবেগ দেখি তাঁর সবে ভাবে অনিবার হইলো আবার একি লীলা?
তাদের উত্তর দিতে ভক্ত এক আচম্বিতে বলে শুন রহস্যের খেলা।।
একদিন প্রাতঃকালে প্রভু মোর অশ্রুজলে অঝোরে ভাসায় দু'নয়ন।
এরূপ ভাব নিরখি ভক্তগণ দেখা দেখি বিষাদিত হ'ল সর্বজন।।
অনুক্ষণ কাদে সবে সকলেই মনে ভাবে জিজ্ঞাসিতে না সরে বচন।
একজন বৃদ্ধ ভক্ত নিজেকে করিয়া শক্ত জিজ্ঞাসিল ক্রন্দন কারণ।।
কহকহ বাবা মোরে কি কারণে অশ্রুঝরে দুঃখ মোরা পাই অতিশয়।
শুনিয়া জুড়াই ব্যথা প্রাণ খুলে কও কথা বড় দুঃখ পাই যে হিয়ায়।।
শুনিয়া ভক্তের কথা বলিছে ঠাকুর যথা "মোর কোন দুঃখ কষ্ট নাই।
অপছন্দ আমি করি জীবের স্বভাব হেরি এবে আমি তোমাকে জানাই।।
যেই রাত্রি গেল চলে মিলি দেবতা সকলে আশ্রমেতে হ'ল উপনীত।
ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশাদি আর যত হ'ল ইন্দ্রচন্দ্র বরুণাদি একত্রিত।।
দেখিতে আসিল মোরে এইমাত্র গেল ফিরে উদাস তাহাতে মম প্রাণ।
অবিশ্রান্ত আঁখিজল পড়িতেছে অবিরল বিষাদের এই সে কারণ।।"
প্রভুর শুনিয়া বাণী সবে করে জয়ধ্বনি উচ্চৈঃস্বরে করিল ক্রন্দন।
ব্রহ্মা আদি দেবগণ ভজে যাঁরে অনুক্ষণ সম্মুখেতে সেই প্রাণধন।।
এহেন সৌভাগ্য হেরি বৃথাকাল ক্ষয় করি জানিয়া শুনিয়া বিষ খাই।
তোমার চরণ বিনে হতভাগ্য অভাজনে তরাইতে আর কেহ নাই।।
"শুন শুন প্রাণ ধন ভজন বিহীন জন অযাচিত করুণা সে চায়।
নিজগুণে কৃপা করে শ্রীচরণ দাও মোরে নিবেদন করি রাঙ্গা পায়।।
কত জন্ম গেছে চলে এবারও কি বিফলে? কেটে যাবে মায়াতে জীবন।"
ভক্তগণ বলে সবে "সে কথা কি মিথ্যা হবে?
তুমি প্রভু পতীত পাবন।।
দুঃখ কষ্ট যত পাই তাতে কোন ক্ষতি নাই এই ভিক্ষা চরণে জানাই।
যত জন্ম ঘুরি ফিরি তব চিন্তা হৃদে করি এই কর রসময় রাই।।
কি বলে ডাকিলে পরে তব কৃপা পায় নরে কিছুই তো জানি না ঠাকুর।
বুঝাইয়া দাও মোরে কি গতি হইবে পরে অবোধের চিন্তা কর দূর।।
কি কর্মেতে সুখী হও বুঝাইয়া মোরে কও এই মম মন আকিঞ্চন।
সাধু শাস্ত্রে আছে শুনি মুক্ত কর জ্ঞান দানি মিথ্যা নাহি হবে কদাচন।।
যশোদা নন্দন যেই শচী সূত হ'ল সেই রাইরূপে এবার উদয়।
অপ্রকটে হরিচাঁদ পাই এবে রাইচাঁদ বঞ্চিত না করিবে আমায়।।
মাতৃগর্ভ হতে আসি প্রপঞ্চ সংসারে পশি দিবানিশি হই জ্বালাতন।
নিজগুণে কৃপা করে উদ্ধার করহ মোরে এই মোর শেষ নিবেদন।।
রাই রসরাজ লীলা শুনিলে গলয়ে শিলা না গলিল এ পাষাণ মন।
নিজ গুণে যা করিবে শুন প্রভু মম অধমের তাই হবে প্রাণধন।।
তোমা সঁপে দেহ প্রাণ যাহে করি অবস্থান
দেহের ভিতরে তুমি কি।
যাহা ইচ্ছা কর রাই তুমি ছাড়া বন্ধু নাই পদে পড়ে সদা যেন ডাকি।।
রসরাজ লীলামৃত
পান কর অবিরত
কেটে যাবে কলি অন্ধকার।
ফুকারিয়া বল ভাই জয় রসরাজ রাই
রাইময় জগৎ সংসার।।
পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন


0 Comments