রাই ঠাকুর লীলামৃত পর্ব 6

 



রূপ বর্ণন লীলা



জয় জয় রসরাজ জয় রাইচাঁদ, শ্রীপদ পাইতে জীবে বহুদিন সাধ।

অপূর্ব তোমার রূপ কে করে বর্ণন, সেই সে বুঝিবে যাঁরে করাও দর্শন।

পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদে যে জ্যোতির ছটা, তবরূপে করিয়াছে অপরূপ ঘটা।

তাহাতে পাগল হ'ল ভক্ত মহানন্দ, গোলক নেহারি রহে সদা প্রেমানন্দ।

জয় জয় ভক্ত প্রাণ জয় হে শ্রীরাই, তোমার করুণা বিনা আন নাহি চাই।

ওড়াকান্দি গিয়াছেন ঠাকুর একদা, বর্ণিব হেথায় কিছু লক্ষণ বারতা।

নগেন ঠাকুর যিনি বি.এ. পাশ করে, জীবন দিলেন শুধু জনহিত তরে।
একদিন ঠাকুরকে অতি যত্ন করি, সেবা করাবার ইচ্ছা মনে হ'ল ভারী।

নগেন ঠাকুর আর অন্য একজনে, যতন করিয়া আনে অতি কায়মনে।

অন্য সেই ভক্ত হয় লক্ষ্মীকান্ত নাম, শাস্ত্রজ্ঞ বৈষ্ণব বাড়ি দেবাসুর গ্রাম।

তারক গোসাঁই বাড়ি বহুদিন থাকি, সরকারি শিক্ষা করে আছে কিছু বাকী।


তাঁহাকেও যত্ন করে নগেন ঠাকুর, শুনিবার বাঞ্ছয়ে আলোচনা মধুর।

দুইজন সাধু আর নগেন ঠাকুর, পাশাপাশি বসে সবে নহে বেশী দূর।

পদ্মাসনে করি সবে বসিছে সেবায়, পদতলে রেখাগুলি সব দেখা যায়।

ঠাকুর বসিয়া আছেন মধ্যের আসনে, লক্ষ্মীকান্ত বামে থাকি দেখে সঙ্গোপনে।

শুভ চিহ্ন যত আছে দেখিছে চাহিয়া, রেখা দেখি বিমোহিত হ'ল তাঁর হিয়া।

মনে মনে চিন্তা করে করিয়া বিচার,

মহাপুরুষের চিহ্ন দেখি যে ইঁহার। আহারের কথা সব ভুলিয়া গিয়াছে,

অনিমেষ নয়নে সে চাহিয়া রয়েছে। তখন ঠাকুর তাঁকে দিল এক ঠেলা,

বারান্দার নীচে পড়ে হইয়া বিহ্বলা। নগেন ঠাকুর বলে, "সাধু মহাশয়,

এতবড় ঠেলামারা উচিত কি হয়?" ঠাকুর বলেন, “দাদা থাকি অন্যমনে,

বিড়ালেতে মাছগুলি নিবে যে এখনে। এইমত চিন্তা করি তাড়াই মার্জারে,

দূরে না থাকিয়া কেন কাছে এল সরে।"

লক্ষ্মীকান্ত কোন কথা বলিতে পারে না, মনের ভিতর শুধু করে গবেষণা।

নিবেদন করি যবে মুখ মেলেছিল, মুখের ভিতর তাঁর লালাভা দেখিল?

বুঝিল এ শুভ চিহ্ন মাত্র অবতারে, পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ইহার ভিতরে।

তখন সে লক্ষ্মীকান্ত করিছে চিন্তন, ভাই বলে ডাকি তাঁরে এ আর কেমন?

মহাপুরুষের হয় বত্রিশ লক্ষণ, রাইচাঁদ দেহে তাহা রয়েছে অঙ্কন।

ভোজের ক্রিয়াদি সব সমাপন করি, গুরুচাঁদ সকাশেতে চলিল বাহুড়ি।

গুরুচাঁদ বলিলেন, "শুন লক্ষ্মীকান্ত, চুল শেলা না মারিলে হইবে বিভ্রান্ত।"
লক্ষ্মীকান্ত কোন কথা বলিতে পারে না, মনের ভিতর শুধু করে গবেষণা।

নিবেদন করি যবে মুখ মেলেছিল, মুখের ভিতর তাঁর লালাভা দেখিল?

বুঝিল এ শুভ চিহ্ন মাত্র অবতারে, পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ইহার ভিতরে।

তখন সে লক্ষ্মীকান্ত করিছে চিন্তন, ভাই বলে ডাকি তাঁরে এ আর কেমন?

মহাপুরুষের হয় বত্রিশ লক্ষণ, রাইচাঁদ দেহে তাহা রয়েছে অঙ্কন।

ভোজের ক্রিয়াদি সব সমাপন করি, গুরুচাঁদ সকাশেতে চলিল বাহুড়ি।

গুরুচাঁদ বলিলেন, "শুন লক্ষ্মীকান্ত, চুল শেলা না মারিলে হইবে বিভ্রান্ত।"

গুরুচাঁদ হেসে বলে, "আহা! বেশ বেশ, বেহুস হইলে কিন্তু হয়ে যাবে শেষ।
হেঁয়ালির ভাবে বলে কথা গুরুচাঁদ, হেনকালে সেইখানে এল রাইচাঁদ।
এদিকেতে গুরুচাঁদ ভাগবত শুনে, বৃন্দাবন লীলা কথা শ্রীদামের সনে।

একদিন কৃষ্ণচন্দ্র গেলেন গহনে, শ্রীদাম বসিয়া পার্শ্বে চিন্তে নিজ মনে।
শ্রীকৃষ্ণে সখ্যতা করি ভাই বলি যাঁরে. অনন্ত অসীম তিনি বুঝি ব্যবহারে।
সে কথা ভুলিয়া গিয়া কাঁধে কত উঠি, কত অপরাধ করি না বুঝিয়া খাঁটি।
এইরূপ চিন্তা যবে শ্রীদাম করিল, সজোরে শ্রীকৃষ্ণ তাঁরে মুষ্টাঘাত দিল।

বেদনায় শ্রীদামের ক্রোধ উপজিল, মার কেন বলিয়া সে দাঁড়ায়ে উঠিল। শ্রীকৃষ্ণ বলিছে, "তব বুদ্ধি নাহি ঘটে,

ওরূপ চিন্তাতে আমি থাকি না নিকটে। অব্যক্ত-অচিন্ত্য আমি হই নিরাকার, স্বরূপেতে ধরা দেই যবে অবতার।"


শ্রীদাম বুঝিয়া মর্ম ধরে শান্ত ভাব, গোপগোপী বিনা কেহ বুঝে না স্বভাব।


সর্বভূতে বিরাজিছে অনন্ত ঈশ্বর, ভক্ত সনে সাকারেতে খেলে নিরন্তর।


সর্বত্র যাঁহার স্থিতি সেতো নিরাকার, অব্যক্ত সাকার হয় যবে অবতার।



ইচ্ছা করি রূপ ধরে খেলিতে কৈতবে, লীলা বলি যারে ভক্ত প্রচারিছে ভবে।


তখনেতে রাইচাঁদ লক্ষ্মীকান্তে কয়, "তোমার ঠাকুর কিবা ভনে এ সময়।" লক্ষ্মীকান্ত মহাবিজ্ঞ বুঝিতে পারিল,

পূর্বের ঘটনা তাঁর মনেতে পড়িল।


গোসাঁই তারক তাঁরে যাহা বলেছিল, দয়া করে আজ বুঝি তাহা প্রকাশিল।

কোন স্থানে একদিন গানের আসরে, পাঁচালী তারক বলে মহানন্দ ভরে। ক্রমে ক্রমে মহাভাব উথলিয়া ওঠে,


আসরের লোক সব বসে নাই মোটে। সকলেই পড়িয়াছে প্রেমেতে ঢলিয়া,


কোলাকুলি করে সবে আনন্দে মাতিয়া। হেনকালে শ্রীতারক আসি বাহুড়িয়া,


রাইচাঁদ পদ ধরি পড়ে লোটাইয়া। রাই রসরাজ ছিল তখন বালক, কাঁদি বলে, "তার মোরে হে বিশ্ব পালক।"


তারক গোসাঁই ছিল অতি গুণবান, শত শত গুণগ্রাহী ভক্ত বর্তমান।

অতীব দুঃখিত তারা সকলে হইল, বালকের পদ কেন কর্তায় ধরিল।


মন দুঃখে সবে মিলি বলিছে তখন, "ও চরণ ধরি প্রভু কাঁদ কি কারণ?"


তারক বলিছে, 'উহা বুঝিতে পারি না, সামান্য মনুষ্য নহে হয় বিবেচনা।


যদি কোন ঘরে যার বেড়া ঘেড়া দেয়া, চতুর্পাশ দিয়া যায় ধুম বাহিরিয়া।


অনুমান করে সবে অগ্নি আছে মাঝে, তেমনি ইঁহার মাঝে হরিচাঁদ রাজে।


আমি দেখিতেছি তাহা প্রকট ভাবেতে, তাঁরে না ধরিয়া আমি থাকিব কি মতে?


তোমাদের ভালমন্দে মোর কিবা হয়?

রত্নাকর পাপ ভাগ কেহ নাহি লয়।


সময়েতে কর্মফল ভোগে মহাশয়, সেহেতু কাতরে দীন করুণা বাঞ্ছয়।

পূর্ব স্মৃতি লক্ষ্মীকান্ত করিয়া স্মরণ, প্রেমানন্দ সাগরেতে হ'ল নিমজ্জন।


সাধন ভজন বিনা কেবা কৃষ্ণে পায়?


সাক্ষাতে গেলেও তাঁরে চেনা বড় দায়, রাই রসরাজ যিনি তনি কৃষ্ণধন, হরিচাঁদে রাইচাঁদে অভিন্ন তেমন।


প্রেমের ঠাকুর মূর্তি প্রতীক যে রাই, কায়মনে স্মরি তাঁরে বলিহারি যাই।


রাই রসরাজ লীলা অমৃত সমান, বিজ্ঞ জনে বলে ইহা শুনে পুণ্যবান।

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Post a Comment

0 Comments