মোক্ষণ লীলা


জয় জয় রাইচাঁদ অনাথ শরণ, জীবের নিস্তারে প্রভু তব আগমন।

উজ্জ্বল পিরীতি রস যাহা ব্রজে ছিল, গোপগোপী রাধা সনে যে রস লভিল।

শান্ত-দাস্য-সখ্য আর বাৎসলাদি রস, মাধুর্যসহ পঞ্চমে হয় কৃষ্ণ বশ।

যেই যেই ভাবে পূর্বে হয়েছে নির্ণয়, কিভাবে বুঝিবে জীব তাঁর পরিচয়।

বুঝাইতে সে নিগূঢ় পঞ্চরস খেলা, বাশুড়িয়া আসি কর এবে সেই লীলা।

লীলার সখীরা যত আর সখাগণ, কত যে রয়েছে তাঁরা কে করে গণন।

বাশুড়িয়া পার্শ্ববর্তী সেনেশ্চর গ্রাম, সেখানেতে লীলা তাঁর অতি অনুপম।

আদান নামক ছিল ভক্ত একজন, বাল্যকাল হতে তার সঙ্গেতে ভ্রমণ।

ঠাকুরের সঙ্গী হয়ে সেই মহাজন, কত যে করেছে খেলা নাহি নিরূপন।

বয়স অধিক তাঁর অদ্বৈত প্রায়, পুরীধামে মাধবের সম বলা যায়।

আদান বালার সাথে একদিন যায়, নাড়া কাটিবারে প্রভু ছিটাবাড়ি গাঁয়।

দৈবেতে ঘটিল সেথা বিভূতি প্রকাশ, যাহার শ্রবণে সর্ব অনর্থের নাশ।

আজ মরে কাল মরে পড়ে আছে শশী, ঠাকুরের সঙ্গী সেই ঐ গ্রাম নিবাসী।

শশীর জননী ছিল ভক্তি যুক্তা নারী, আদানের উপদেশে নিল যত্ন করি।
 'বেদনা রোগেতে শশী হ'ল মৃতপ্রায়', তাহার জননী তাহা ঠাকুরে জানায়। 
আমার এ পুত্রটিকে দিনু তব পায়, যাহা ইচ্ছা কর তাহা বেঁধনা মায়ায়। 
হরিচাঁদ লয়েছিল ব্রজরে যেমন,রাইচাঁদ রূপে লও শশীরে তেমন।
এতেক শুনিয়া প্রভু পেটে দিল হাত, রোগশয্যা ছাড়ি শশী করে প্রণিপাত।

বলে, "প্রভু জন্মে জন্মে লও কর সাথী, অজ্ঞান অবোধ বলে মার যদি লাথি।

তাহাতেও ছাড়িবনা ওপদ রাতুল, মায়া মোহ ছাড়াইয়া ভাঙ্গ মোর ভুল।

প্রভু বলে, "ওরে শশী ভুলিলি কেমনে?মাতা তোরে সঁপিয়াছে আমার চরণে। 
তথাস্তু বলিয়া আমি করেছি গ্রহণ,তুই ছাড়িলেও নারি ছাড়িতে কখন।"
 সেই হতে ভক্ত শশী এল বাশুড়িয়া চিরদিন র'ল সেই ভাবেতে ডুবিয়া।
 এইরূপে কতজনে উপদেশ দিয়া,,ঠাকুরের চরণেতে জুড়াইছে হিয়া। 
ঠাকুরের সঙ্গে যায় ভ্রমণে যখন, প্রেমের সাগরে মগ্ন রহে অনুক্ষণ।
 সংসারে আসিয়া পায় কতরূপ জ্বালা, অন্তর তাহাতে হয় কত ঝালাপালা। 
একদা আদান বলে, ঠাকুরের কাছে, 'তোমার নিকটে মোর অভিযোগ আছে।'
 তব সঙ্গে থাকি বাবা কত শান্তি পাই, বাড়িতে থাকিলে মোর দুঃখ ছাড়া নাই।
দারা পুত্র কন্যাগণ আছে যতজন,

তারা সবে সদা মোরে করে জ্বালাতন। ইহার উপায় কিভাবে আছে মহাশয়?

কৃপা করি প্রতিকার কর দয়াময়। ঠাকুর বলেন, শুন বালা মহাশয়,

কি বলিব তোমা আমি ইহার উপায়। যদি কেহ বৃক্ষ সব করয়ে রোপণ,

আম-জাম তাল-বেল কদলীর বন। আর অম্ল কটু তিক্ত মিষ্ট ফল আছে,

সময়েতে সব বৃক্ষে ফল ধরিয়াছে। নিজের রোপিত বৃক্ষে ফল যদি হয়,

না খাইয়া পারে কেবা বল মহাশয়। স্বকৃত কার্যের ফল ব্যর্থ নাহি হয়,

মহাপ্রভু পুরীধামে এই কথা কয়। ভোগে ভোগ হয়ে থাকে প্রারন্ধের ক্ষয়,

ত্বরায় নামেতে কাটে শাস্ত্রে ফুকারয়। রাইচাঁদ বাণী শুনি শ্রীআদান বালা,

মাথা নাড়ি মানি লয় বদন উজ্জ্বলা। বলে "প্রভু, অজ্ঞ আমি তাহে নহি ভক্ত,

অতশত বল কেন হও নাকো শক্ত। নিজগুণে কৃপা করে পদে দিয়া স্থান,

আমারে আপন জ্ঞানে করিবেক ত্রাণ। তোমার অসাধ্য কিছু ত্রিভুবনে নাই,

ছলনা বুঝিতে শক্তি বল কোথা পাই?

মৃদু হাসি প্রভু তাঁরে অভয় দানিল, এতক্ষণে মুখে হাসি ফুটিয়া উঠিল। রাইচাঁদ এসেছেন তারিতে পামর,

করুণা করিতে প্রভু না হয় কাতর। সুকঠিন প্রশ্নের কি সহজ উত্তর,
পাইয়া আদান বালা কাঁদিল বিস্তর।

বিদায়ের বেলা বলে, "শোন মহাশয়, জঠর যন্ত্রণা হতে অধিকতো নয়।"

সদা নামে মত্ত রও কাটিবে জঞ্জাল, হরিনাম বিনা আর নাইরে সম্বল।

আদি লীলা শেষ হলো মধ্য লীলা শুরু, জানিল জগৎবাসী তুমি জগৎ গুরু।

যদি প্রভু কোনভাবে জানায় সন্দেশ, আগামীতে আদি লীলা হবে নব বেশ।

আদি লীলা শেষ হ'ল বল জয় রাই, রাই প্রীতে হরিধ্বনি দেও হে সবাই।

রাই রসরাজ লীলা অমৃত সমান, ভক্তিভাবে সর্বকালে কর সবে পান।

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন