শ্রীশ্রী রাই রসরাজ লীলামৃত


                                              শ্রীশ্রী রাই রসরাজ লীলামৃতের ইতিবৃত্ত


                         শ্রীশ্রী রাই রসরাজ ঠাকুরের পরিচিতি ও লীলামৃতের সংক্ষিপ্ত বিবরণ


গোপালগঞ্জ জেলার টুংগীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত বাশুড়িয়া গ্রামে ১২৮৯ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসে রোজ বৃহস্পতিবার ভরা পূর্ণিমায় পূর্ণব্রহ্ম শ্রীশ্রীরাই রসরাজ ঠাকুর আবির্ভূত হন। তাঁর পিতা ছিলেন স্বর্গীয় চুবন বিশ্বাস এবং মাতা ছিলেন স্বর্গীয়া ঘাগরী দেবী। অধ্যাত্ম স্থরে শ্রীশ্রীরাই রসরাজ ঠাকুর ছিলেন যুগাবতার। ওড়াকান্দি "শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর" পরবর্তীতে শ্রীশ্রীরাই রসরাজ ঠাকুররূপে এ ধরাধামে বাশুড়িয়ায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। যা শ্রীশ্রীরাই রসরাজ লীলামৃতের আবির্ভাব লীলায় প্রকাশিত হয়েছে।

যিনি প্রেম-ভক্তির রসোসরোবরে জীব জগৎকে আপ্লুত করে উচ্চ-নীচু, বাল-বৃদ্ধ ও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক নতুন দিগন্তের দিক নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন ভক্তের মাঝে যে লীলা-খেলা করেছিলেন তা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হলে কয়েকটি মহাকাব্য রচিত হ'ত। "শ্রীশ্রীরাই রসরাজ ঠাকুর" বাংলা ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে ৮ই কার্তিক মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৫.৪৫টায় লীলা সংবরণ করে অপ্রকট হয়েছেন। ঠাকুরের কৃপা প্রাপ্ত অনেক ভক্তই "শ্রীশ্রীরাই রসরাজ লীলামৃত” লেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও শেষে শ্রীশ্রীরাই রসরাজ এর একনিষ্ঠ সেবক ভক্তপ্রবর শ্রী সতীশ চন্দ্র গোস্বামী সংক্ষিপ্তভাবে "শ্রীশ্রীরাই রসরাজ লীলামৃত” লেখার প্রয়াস পেয়েছেন। এ লীলামৃত প্রকাশের জন্য সম্পাদকের ভূমিকা পালন করেছেন ভক্ত প্রবর শ্রীকৃষ্ণ দাস বিশ্বাস।

লীলামৃতকে তিনটি অংশে বিভক্ত করা হয়েছে, যেমন-অদি লীলা, মধ্য লীলা এবং অন্তলীলা। আদি লীলায় মঙ্গলাচরণ, বন্দনা এবং ঠাকুরের জন্মলীলা থেকে শুরু করে ভক্তদের সাথে প্রকাশিত বিভিন্ন লীলার কথা সংক্ষিপ্ত আকারে ৬৬০ টি শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্য লীলায় মঙ্গলাচরণ, সাধু সেবা লীলা সহ অন্যান্য লীলা এবং বিভিন্ন ভক্তদের সাথে লীলা-খেলা সম্বলিত উপাখ্যান ৪৫১০ টি শ্লোকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর অন্ত লীলায় মঙ্গলাচরণ ও বিভিন্ন ভক্তদের সাথে লীলা ও উপাখ্যান সম্পর্কে ৮০৫ টি শ্লোকের মাধ্যমে এবং নতুন সংযোজন লীলা ৪৫৭ টি শ্লোকের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। এ লীলামৃত পাঠে এবং আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ, নৈতিকতা, আত্মসম্মান, সাম্য, মৈত্র, ভ্রাতৃত্ব ও স্বাধীনতাবোধ জাগ্রত করবে।


"শ্রীশ্রী রাই রসরাজ লীলামৃত”

আদি লীলা

মঙ্গলাচরণ


জয় জয় রাইচাঁদ জয় গোরাচাঁদ, জয় জয় রসরাজ যিনি হরিচাঁদ।

জয় জয় গুরুচাঁদ করুণাবতার, যাঁর আশীর্বাদে হয় রাই অবতার।

জয় জয় শ্রীচুবন জয় শ্রীঘাগরী, যাঁহাদের হতে পাই পারের কাণ্ডারী।

জয় জয় ভাগ্যবতী দেবী বিন্দুপ্রিয়া, লক্ষ্মী বিষ্ণুপ্রিয়া মিলি দোঁহে এক হিয়া। ৪

জয় জয় মহানন্দ জয় শ্রীগোলক, মানবে পাইল যাহে প্রেমের আলোক।

জয় জয় রাই ভক্ত দান প্রেমানন্দ, প্রণমী ঠাকুর পদে শ্রীজগদানন্দ।

জয় জয় ভগবান সর্ব অবতার, পূর্ণব্রহ্ম রাইরূপে করহ উদ্ধার।

সাধু গুরু বৈষ্ণবেরে করি দণ্ডবৎ, কৃপা করি পাপ নাশি কর মোরে সৎ।


বন্দনা



বন্দি আমি কবিগুরু মহর্ষি বাল্মিকী, ধ্যানেতে পাইল যিনি শ্রীরাম জানকী।

পরে বন্দি ভগবান দ্বৈপায়ন ব্যাসে, যাঁহার কৃপায় বেদ ভুবনে প্রকাশে।

তৎপর তৎপুত্রে নমি শুকদেবে, ভাগবতী বাণী যৈছে শুনাইল জীবে। কবিরাজ কৃষ্ণদাসে বন্দি অতঃপর.

মহাপ্রভু লীলা যিনি করেন প্রচার। এরপর বন্দি আমি কবি রসরাজে,

যাঁর লেখা হরিলীলা জগতের মাঝে। যথাস্থলে লীলা কথা বর্ণিব বিশেষে,

অভাজন মাগে দয়া কবিত্বের আশে। কবীন্দ্র রাজেন্দ্রে নমি অতি ভক্তি ভরে,

মহাশক্তি পায় যিনি রাইচাঁদ বরে। যত যত মহাকবি বৈষ্ণবেরগণ, শিরে ধরি বন্দি আমি সবার চরণ।

তাঁহাদের কৃপা যদি মোর প্রতি হয়, তা'হলেই রাইলীলা স্ফুরিবে হৃদয়।

এইমত আশা আর ঠাকুর আদেশে, মজিতে চাহিছে প্রাণ রাই প্রেম রসে।

রাইচাঁদ আত্মজ শ্রীশ্রী জগদানন্দ, ঠাকুর তাঁহারে বলি নাহি কোন সন্ধ। রাইচাঁদের কথামত তিনি মম সাঁই,

পদে রেখ প্রভু মোরে প্রার্থনা জানাই। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রণাম,

জানায়ে আরম্ভ করি "জয় রাই" নাম। ছোট বড় নির্ণয় করিতে সাধ্য নাই,

সবার চরণে মোর প্রণতি জানাই।

মনুষ্য-কীট-পতঙ্গ নমস্য আমার, স্রষ্টার সৃষ্টিরে মোর কোটি নমস্কার।


অবতরণিকা


জয় জয় রাইচাঁদ করুণাবতার, প্রেমদানে করে যিনি জীবের উদ্ধার।

জয় জয় রসরাজ প্রভু বিশ্বপতি, জয় জয় মহাপ্রভু অগতির গতি।

জয় জয় প্রভু মোর শ্রীরাই মোহন, জয় জয় পরিত্রাতা জীবের জীবন।

জয় হে সর্বস্ব মোর অন্তর্যামী গুরু, চরণে শরণ নিয়ে যাত্রা হোক শুরু।

প্রপঞ্চে চিনিতে নারে তব কৃপা বিনা, দিব্য দৃষ্টি দান প্রভু করে পাপহীনা।

জয় জয় নব গৌর প্রেম অবতার, নিজগুণে নাশ মোর মূর্ত অহঙ্কার।

লীলা রসে মত্ত করি ডুবাও যাহারে, করুণার কণা লভি অনায়াসে তরে।

ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব তুমি জয় পরাৎপর, পরম ঈশ্বর তুমি জয় সারাৎসার।

সৃষ্টি স্থিতিলয়ে তুমি সর্বব্যাপী স্থিতি, পরম আরাধ্য জ্ঞানে জানাই প্রণতি।

অন্তর্যামী তুমি প্রভু জয় হৃষিকেশ.

ইচ্ছাময় গুড়াকেশ তুমি পরমেশ।

তোমারে লভিতে আছে শত কোটি পথ, বেদ-বিধি-শাস্ত্র মতে ভিন্ন ভিন্ন মত।

ঘুরিয়া দেখেছি সব এবে হয়রান,

অশক্য সর্বথা হয়ে ডাকি ভগবান।
জীবের দুর্গতি হেরি হলে অবতার,

তুমি ছাড়া কেহ নাই করিতে উদ্ধার। তুমি রাম তুমি কৃষ্ণ তুমি গৌর হরি,

সর্বময় তুমি রাই পারের কাণ্ডারী।

তুমি হে করুণাসিন্ধু বাঞ্ছাকল্পতরু,

জীবের জীবন দাতা কর যাহা চারু।

রেচক কুম্ভক ধ্যান ন্যাস পূজাবিধি,

সর্বাংশে অযোগ্য জীব জানে মাত্র যোধী। হেরিয়া জীবের দুঃখ যাঁর অবতার,

সেই প্রভু রাইচাঁদে কোটি নমস্কার। ভুবন মোহন রূপ নাহিক তুলনা,

জন্মে নাই হেন জন করিতে বর্ণনা। কোকনদ পদ যিনি বালার্ক প্রকাশ,

দ্বাত্রিংশ লক্ষণসহ ভাবের উল্লাস। আজানুলম্বিত বাহু দীর্ঘ কলেবর,

ঢুলু ঢুলু বাঁকা আঁখি বয়ান সুন্দর।

তপ্ত স্বর্ণ বর্ণ যাঁর সমুন্নত নাসা, মুখে মৃদু মন্দ হাস ক্ষরে মধুভাষা।

চন্দন চর্চিত ভালে রহে উর্ধনেত্র, বরাভয় দানকারী দেখি নাই কুত্র।

শ্বেত বস্ত্র পরিহিত বিশ্ব বিমোহন, দীর্ঘ-শ্মশ্রু প্রেমোন্মত্ত জীবের জীবন।

তুলসী মালিকা গলে কুঞ্চিত চিকুর, প্রণমামি হে প্রাণেশ প্রেমের ঠাকুর।

ভক্ত ভাগবতগণে দিতে নারে সীমা,

কোন মন্ত্রে বন্দি তোমা প্রকাশ মহিমা। না জানিনু আবাহন না জানি পূজন,

দীনহীন আকিঞ্চন তা'হেতো কুজন। সর্বশক্তিমান তুমি একক কুটস্থ,

সর্বজ্ঞাতা সর্বদ্রষ্টা মুইতো তটস্থ।
তবুও বাঞ্ছিনু চিতে বন্দিবারে তোমা, অধম তারণ বলে করিবেক ক্ষমা।

কাঙ্গাল ঠাকুর তুমি পতীত পাবন, ভাসাইয়া লহ দিয়া প্রেমের প্লাবন।

দীনবন্ধু তুমি প্রভু বিপদ ভঞ্জন, জনার্দন নাম তব শ্রীমধুসূদন।
অনন্ত তোমার নাম অনন্ত মহিমা, নারদাদি দেবগণে দিতে নারে সীমা।
ক্ষুদ্রতম নগণ্যের কিবা সাধ্য আছে?
অব্যক্ত অচিন্ত্য তুমি রহ হৃদি মাঝে।
পঙ্গু পারে লঙ্ঘিবারে গিরি সুমহান, মুকও ভাষিতে পারে সুমধুর তান।
তোমার কৃপাতে পারে অন্ধও দেখিতে, একমাত্র তুমি তাই আরাধ্য জগতে।
পত্র-পুষ্প ফল-জল কিছু মোর নাই, আত্মব্রহ্মে ব্রহ্মাহুতি লওগো শ্রীরাই।
ভালবাসা দিয়াছিলে তাই ভালবাসি, ভক্তগণে কত দেয় অশ্রুজলে ভাসি।

জগৎ তারিতে প্রভু তোমার এ লীলা, সেই কথা স্মরি আজি গাঁথি কথামালা।

হাসুক দুষুক সবে শেষে দুঃখ নাই, তোমাতে সঁপিয়া মন কারে না ডরাই।

অনন্ত তোমার লীলা অনন্ত মহিমা, বর্ণিতে দুরাশা মাত্র কিঞ্চিৎ উপমা।

ক্রোধ হোক প্রীতি হোক অথবা করুণা, ভক্ত প্রাণারাম কর্তা নিরাশ করোনা।

ঝিনুকে মাপার মত মহাসিন্ধু বারি,

ভক্তগণ বাঞ্ছাহেতু প্রকাশি ফুকরি।

যেরূপে প্রকাশ তুমি যাঁর যাঁর ঠাঁই,

তেই সে তোমারে হেরে আর জানা নাই।
জয় জয় রসরাজ প্রভু রাইচাঁদ,

কতজনে উদ্ধারিলে পাতি প্রেম ফাঁদ।

অগণর ভক্ত তব কি দিব তুলনা,

তাদের আশিস স্নেহে করিনু বর্ণনা। জয় জয় রাই ভক্ত মোর গুরুজন,

উদ্ধার অধম দাসে মাগিছে চরণ।

যে সকল তথ্যাবলী গ্রন্থেতে প্রকাশ,

সংগ্রহ করিতে পাই ভক্তের প্রয়াস। ধন্য ধন্য ভক্তগণ ধন্য হে সবাই,

প্রকাশিত হয়েছে লীলা জীবে কণা পাই। গ্রন্থের প্রারম্ভে করি প্রভুকে স্মরণ,

যাহা হতে বিঘ্ন নাশ অভীষ্ট পূরণ। প্রেমদাতা পরিত্রাতা লীলাময় হরি,

জীবের নিস্তার লাগি এলে অবতরি। ভগবান ভাগবত আর ভক্তগণ,

এ তিন স্বরূপে হয় মধুর মিলন। শ্রীগুরু বৈষ্ণব শ্রেষ্ঠ সাক্ষাৎ শ্রীহরি,

যাঁর কাছে শেখা যায় তাঁরে মান্য করি। রাইচাঁদ লীলা সঙ্গী বড় ভাগ্যবন্ত,

তাঁহাদের গুণরাশি নাহি আদি অন্ত। আরো আরো বহু জীব লীলা খেলাহেরি,

বহুভাগ্যে ভাব লভি দিল তারা পাড়ি।

মহাশক্তিধর হয় রাই ভক্তগণ, অনায়াসে কাটে তাঁরা ভবের বন্ধন।

সাধু গুরু বৈষ্ণবের চরণ ভিখারি,

শরণ লইবে জীব যাই বলিহারি। এ তিনের দৃষ্টিপাতে বিঘ্ন বিনাশন
যদ্যপিও তিনরূপে মূলে একজন।

ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলে বিষয়ীর মন,

লীলা কথা শুনে যাবে ভবের বন্ধন।
ওঠ বাবা, বেলা যায়” শুনিয়া সে বাণী, লালাবাবু ফিরে পায় হারা চিন্তামণি।

সেইরূপ সুসময় অবশ্যই হবে, রসরাজ লীলামৃত চৈতন্য দানিবে।

রসরাজ লীলা কথা অমৃতের খনি, বিন্দু পানে অমরত্ব জানে শূলপানি।

শোন্ তোরে বলি আমি রে'পাগলামন, অনায়াসে তরবি যদি ধর শ্রীচরণ।

নাম জপ নাম চিন্ত নামী কর ধ্যান, সর্বসিদ্ধি রাই নামে নাশিবে অজ্ঞান।

নামের মহিমা কত জানে ভক্তগণ, একমনে শুন সবে লীলা রসায়ন।

যুগে যুগে কত ভক্ত দিয়া হুহুঙ্কার, সর্ব সংহা হয়ে করে মহিমা প্রচার।

তাই বলি মাতা-পিতা ভ্রাতা-ভগ্নীগণ, অসার ত্যজিয়া ধর প্রভুর চরণ।

শয়নে স্বপনে কিম্বা নিদ্রা জাগরণে, ভুলিওনা রাই নাম সে পরম ধনে।

যেই রাই সেই হরি ভজ নিষ্ঠা করি, নামের সহিত আছে আপনি শ্রীহরি।

রাইচাঁদে হরিচাঁদে ভাবে যেবা দুই, মূর্খ শত্রু বলি বর্জি পঙ্ক্তিতে না লই।

রামলীলা কৃষ্ণলীলা গৌর অবতার, হরিলীলা রাইলীলা সব একাকার।

রাই নামে রাই প্রীতে দেও হরিধ্বনি,

দৃষ্টি শ্রুতি হৃদয়েতে হোক মূর্তবাণী।

রসরাজ লীলা কথা সুধার সমান, অভাজন রহে অজ্ঞ শুনে পুণ্যবান।

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Post a Comment

0 Comments