বাল্য লীলা
জয় জয় রাইচাঁদ বৃন্দাবন পতি, বাল্য লীলা দেখি সবে পায় অনুভূতি।
জয় জয় রসরাজ ব্রহ্ম সনাতন, পতীত উদ্ধারহেতু তব আগমন।
জয় জয় প্রভুপাদ দয়াল গ্রাহার, জগৎ মোহিলে তুমি বাজায়ে বাঁশরী।
রাখাল সখার সনে তুমি কর খেলা, দেখি তাহা মনে হয় ব্রজরস লীলা।
মুনি-ঋষি-যোগী ধ্যানে যাঁরে নাহি পায়, সেই প্রভু এসেছিল বাশুড়িয়া গাঁয়।
রাইচাঁদ বাল্য লীলা বড়ই মধুর, পিরীতি পরমধন তাহাতে প্রচুর।
নিষ্কাম পবিত্র প্রেম যাচিবার আশে, মানুষ হইয়া প্রভু বার বার আসে।
আপনা পাসরি রাই খেলে নিরন্তর, মানুষ বুঝিবে কেবা দেবে বোঝা ভার।
শিশুকাল হতে প্রভু সন্তর্পণে থাকি, প্রচ্ছন্ন ভাবেতে রাখে আপনারে ঢাকি।
গোলকের গুপ্তধন হলে প্রকাশিত, গোলক পাইল খোঁজ তাই উপনীত।
এমন প্রেমের প্রভু কে কোথায় পেয়েছে?
দেবতা গন্ধর্ব সদা যাঁহাকে চাহিছে।
এহেন দুর্লভ রত্ন পাইয়া নিকটে, কায়মনে ভজ তাঁরে সবে অকপটে।
শাস্ত্রে আছে প্রভু নাহি লীলাস্থান ত্যজে, সাক্ষাতে পাইবে সেই যেই তাঁরে ভজে।
এমন দুর্লভ জন্ম পাবে নাকো আর, একান্ত ভাবেতে ভজ চরণ তাঁহার।
সফল জনম হবে কৃপা যদি পাও, পবিত্র স্বভাব হয়ে ডেকে গুণ গাও।
যেইজন ভজে তাঁরে পরাশান্তি পায়, ভুক্তভোগী বিনা তাহা বোঝা বড় দায়।
যাঁরে হেরি ইন্দ্রিয়াদি সব ভুলে যায়, সর্ব রসে পরিপূর্ণ রসরাজ রায়।
চক্ষু খুলে দেখে তাঁর অপরূপ রূপ, হৃদয় তাহার নাচে দেখিয়া স্বরূপ।
নাসিকা ভুলেছে তাঁর পেয়ে অঙ্গ গন্ধ, পারিজাত বাস তাহা নাহি কোন সন্ধ। অমৃতের তুঙ্গ হতে অশ্রু গঙ্গা ঝরে,
রসঙ্গ বিনা কেহ আস্বাদিতে নারে। যখন কর্ণেতে পশে মধুকণ্ঠ তাঁর,
শ্রবণে আনন্দ বাড়ে চিত্ত চমৎকার। সুকোমল দেহ তাঁর কিবা মনোরম, স্পর্শেতে সমাধি লাভ ত্যজিয়া শরম।
মোহন মূরতি হেরি সবে বিমোহিত, গুণাতীত প্রেমভাব জগতে বিদিত।
মানুষের আগমনে প্রেম বন্যা বয়, পরশেতে প্রেম লাভ সকলের হয়।
দর্শনেতে দূরে যায় মনের কালিমা, স্মরণেতে পাপ মুক্ত নাহি যাঁর সীমা।
স্পর্শমণি পরশেতে লোহা হয় সোনা, সেই মতে পায় জীব প্রভুর করুণা।
মহতের সঙ্গ লাভে অন্ধকার যায়, এই কথা সর্ব শাস্ত্রে ফুকারিয়া কয়।
বিশ্বের কল্যাণ করে সাধু মহাজন, মনের মানুষ করে মানুষ রতন।
গরীবের ঘরে জন্মি রাই রসরাজ, প্রেম-ভক্তি দিয়া গড়ে নূতন সমাজ।
কি আনন্দ পায় সবে গৌরাঙ্গ দর্শনে,
যেই তত্ত্ব রাইচাঁদ দেখায় আপনে। ভগবানে ভালবেসে কি আনন্দ হয়,
এই তত্ত্ব বুঝাইতে প্রভুর উদয়। নরদেহে রাইচাঁদ স্বগুণে আসিয়া, গিয়াছে অন্তরঙ্গের কলুষ নাশিয়া।
রাই প্রেমরসে ডুবে যুবক যুবতী, কি আনন্দ লভে নাই বর্ণিত শক্তি।
নয়নের তারা তার ডুবিয়া গিয়াছে, জীবন যৌবন মন সব হারায়েছে।
ব্রজধামে নন্দসুত ছিল মনচোরা, বাশুড়িয়া আসি হ'ল এবে মন হরা।
ভুলিতে পারে না কেহ দেখে একবার, আনন্দ সাগরে ডুবে রহে অনিবার।
অরূপ রতন মণি করিয়া আশায়, অগাধে ডুবিতে চায় ডুবুরীর প্রায়।
যার তার কপালে কি মিলায় মানিক, তবু চিন্তে যদি পাই কৃপায় খানিক।
সাধু সন্ত বলে তাঁরে 'দেব চিন্তামণি,' সে আশায় চাহিয়া রয় যতেক পরানি।
কৃষ্ণ প্রেম কি কেমন বোঝা নাহি যায়, রাইচাঁদ লীলা হেরি বুঝিবে ত্বরায়।
শ্রীরাধা প্রেমের মূর্তি প্রতীক যে জন, এবে ভবে এল সেই শ্রীরাই মোহন।
অনন্ত মুখেতে যাঁরে না যায় বর্ণন, অচিন্ত্য অব্যক্ত সেই পুরুষ রতন।
আসিয়া ধরায় তিনি শোধে রাই ঋণ, শিখালো জীবের সবে হইতে বিলীন।
আমিত্ব ভুলিয়া কর আত্ম সমর্পণ, তা'হলেই পাবে সেই প্রেম মহাধন।
যাহা সত্য তাহা ধর্ম সেই ভগবান,
প্রেমেতে অঙ্কুর তাঁর শাস্ত্রের প্রমাণ। ধন্য ধন্য মীরাবাঈ শ্রেষ্ঠ রাজবালা,
প্রেমেতে পাইল যিনি শ্রীনন্দের লালা।
ঘাগরী চুবন সুতো যদি পেতে আশা, চিনিয়া মানুষ ধর দিয়া ভালবাসা।
রসিক নাগর শ্যাম ধরি রাইরূপ, দেখাইল জীবগণে তিনি রসস্তূপ।
গোপীর বাঞ্ছিত ধন অমূল্য রতন, বিলাইল অকাতরে জীবের কারণ।
ভাগবতগণ তাহা করি অনুভবে, রাই রসরাজ নাম বলিতেছে সবে।
চারিদিকে শুনি তাই জয় রাই রব, ভক্ত হৃদে শোভে যেন অমূল্য কৌস্তুভ।
রসসিন্ধু নিত্য ঘোরে পেতে রস বিন্দু, আকুল পিয়াস তাঁর মিলিবারে বন্ধু।
ঈশ্বর পিপাসু বন্ধু আছে যতজন, সবাই জেনেছে ভবে রাই কি রতন।
পৃথিবীতে আছে যত সাধু মহাজন, অরণ্য পাহাড়ে করে কঠোর সাধন।
সাধনায় জানিয়াছে তিনি কৃষ্ণধন,
সময়েতে স্বীকারোক্তি করে সর্বজন। সেতুবন্ধ রামেশ্বরে উলঙ্গ সন্ন্যাসী, অগ্নি শিখা চক্ষে বহে এমন তেজস্বী।
কঠোর সাধনে জানে রাই কিবা ধন, ব্রহ্মাণ্ড তারিতে এল নর নারায়ণ।
নামে বর্ণে একাকারে শ্রীরাই মোহন, কলিযুগে অবতীর্ণ জীবের কারণ।
গয়া-কাশী-বৃন্দাবন-হরিদ্বার ধাম, সহস্র সহস্র সাধু আছে গুণ গ্রাম।
তাঁহাদের উদ্দেশ্যেতে কোটি নমস্কার, যাঁহাদের কৃপা হতে নামের প্রচার।
তাঁহারাই একবাক্যে করেন স্বীকার, গোলক বিহারী এবে রাই অবতার।
ছোট বড় নির্ণয়ে করিতে সাধ্য নাই, অবতার পূর্ণব্রহ্ম রসরাজ রাই।
মাতুয়ালয়ে ছিলেন বাল্যকালে তিনি, মোল্লাহাট থানা মাঝে গ্রাম দলগুণী।
বেচারাম সরকার মামা তাঁর হয়, তাঁহার বাড়িতে থাকে আনন্দ হৃদয়।
আর্থিক অবস্থা তাঁর অতি ভাল ছিল, চারিটি গাভীর সেবা সেজন করিল।
ঠাকুর লইয়া গাভী চড়াইতে যায়, অন্য রাখালের সনে খেলিয়া বেড়ায়।
লেখাপড়া শিখিবারে যায় পাঠশালা, মন তাঁর পড়ে থাকে হিজলের তলা।
কেবা শিখাইবে তাঁরে বাণীবন্দ্য যিনি, কয়দিন গেল শুধু নররূপে তিনি।
হিজলের গাছ ছিল গোচরের কাছে, অদ্যাবধি সেই গাছ সেখানে রয়েছে।
সেই গাছতলা ছিল থাকিবার থানা, অন্তরালে যথা হতো দেব আনাগোনা।
ভালবেসে বাজাইত বাঁশের বাঁশরী, শুনি সবে মুগ্ধ হতো সকল পাসরি।
কিবা সে মধুর ধ্বনি বংশীর সুস্বর, বিজ্ঞজনে অনুভবে বুঝি পীতাম্বর।
সকল রাখালগণে বড় ভালবাসে, নিকটেতে যায় সবে মনের হরষে।
যায় না ঠাকুর কভু গরু ফিরাইতে, আদেশে রাখালগণ করে পুলকেতে।
সময় সময় গাহে নানারূপ গান, তাহা শুনে সকলের জুড়ায় পরাণ।
ঠাকুর বলেন যাহা সকলেই শুনে, আদেশ মানিয়া লয় খুশী হয়ে প্রাণে।
কোকিলের কণ্ঠ যেনো ঠাকুরের স্বরে, শ্রবণে আনন্দ বাড়ে সবার অন্তরে।
হাম্বা হাম্বা রবে যবে বৎসে দেয় ডাক, ছুটে আসে প্রভু পাশে শুনে সেই হাক।
অঙ্গের আঘ্রাণ লয় কভু চাটে দেহ, কোনটা নর্তন করে পদে লোটে কেহ।
কচিৎ রাখাল মধ্যে পড়ে কারো চোখে, মৃদু হাসি বলে প্রভু, 'ওরা দেখে চোখে।'
পূর্বের জনমে বুঝি ওদের চরানু, জীব মধ্যে শ্রেষ্ঠ জান এই সব ধেনু।
এ সব দেখিলে যাহা কাহাকে বলো না, মিথ্যুক হইবে তুমি ভাবিবে ছলনা।
রাখালের রাজা যেন বৃন্দাবন মাঝে, এইরূপে লীলা করে রাই রসরাজে।
দুধ-সর-ননী খায় মাতুলের বাড়ি, বালকেরা কাছে থাকে নাহি যায় ছাড়ি।
নিজেরা নাহি খেয়ে তাঁহারে খাওয়ায়,
ভুঞ্জাইয়া যেন তারা বড় তৃপ্তি পায়। ব্রজ সখা তাঁরা ছিল গৌর ভক্তগণ, সখ্যভাবে তাহাদের দিত আলিঙ্গন।
ক্রমাগত এইরূপ কয়েক বছর,
মামা বাড়ি থাকি লীলা করে নিরন্তর। বাল্যকাল হতে হয় ভাবের উদয়,
সুললিত কণ্ঠে গান গাহিত সদায়। সেই গান শুনা যায় ভক্তগণ মুখে,
যাহাতে আনন্দ বাড়ে সুখ হয় দুঃখে। প্রয়োজন যতটুকু গায় ততখানি,
প্রকারান্তরে শিখায় ভজ গুণমণি। দুই এক পদ মাত্র গাহিতেন তিনি,
তাহাতেই প্রস্রবণে বহে মন্দাকিনী। কৌতূহল প্রশমনে লিখি সেই গান,
আনন্দ পাইবে সবে জুড়াবে পরাণ।
ভোলা মনরে আমার বেয়ে যানা দাঁড়, তোর কিসের ফাল্গুন কিসের আষাঢ়।'
মনে রাখিস নিরবধি, যাঁরই তরী তাঁরই নদী?
তোর হালে যখন আছে হরিচাঁদরে, ও তুই তুফানের ভয় করিস নারে।
আর এক সঙ্গীতের লিখি দুই ছত্র, যাহার শ্রবণে হবে অন্তর পবিত্র।
'সাগর শুকাল মানিক লুকাল অভাগিনীর কপাল দোষে' জীবে শিক্ষা দিতে প্রভু এইমত ঘোষে।
শয়নে স্বপনে আর নিশি জাগরণে, মিষ্ট ভাষে সদালাপে তোষে সর্বজনে।
পূজ্যপাদগণে সদা করে দণ্ডবৎ, পদধূলি লয় শিরে পাতি দুই হাত।
সদালাপে সর্বক্ষণ বিনয় বচনে, বিমোহিত করি সবে করায় আপনে।
সকলেই চমৎকৃত ব্যবহারে তাঁর, চঞ্চল স্বভাব বটে হাসি প্রশংসার।
চলনে বলনে তাঁর অদ্ভুত মহিমা, সকলেই পায় তাহে অতি মাধুরীমা।
কিশোর বয়সে তাঁর বাড়ে অঙ্গ কান্তি, দর্শনেই মানুষের কেটে যায় ভ্রান্তি।
রাই রসরাজ লীলা কে পারে বর্ণিতে, মহাসাগরের মাঝে বিন্দু অনুপাতে।
রসের সাগর রাই সকলের প্রভু, কুলমান ডালি যায় চায় তাঁরে তবু।রসরাজ বাল্য লীলা অমৃতের ভাণ্ড, প্রেমোদয় হয় শুনি তরিবে পাষণ্ড।
পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন


0 Comments