প্রেমের স্বরূপ প্রকাশ লীলা
জয় জয় রাইচাঁদ বাঞ্ছাকল্পতরু, জয় জয় মহাপ্রভু জয় জগৎ গুরু।
প্রেমের স্বরূপ জানি হয় নিরাকার, সাকার রূপেতে দেখি রাই অবতার।
জয় জয় ভক্তকুঞ্জ আর মহামায়া, তোমার কৃপাদানে রাই পদছায়া।
'নিশ্চয় নিশ্চয় পাবে' নাহিক অন্যথা, জয় জয় হবে জয় রাই ভক্ত গাঁথা।
ডাক্তার কুঞ্জের বাড়ি পাঁচখোলা হয়, তাহার গুণের কথা বলা নাহি যায়।
রোগী ভোগী অনাথের চিকিৎসার তরে, ডাক্তার উপাধি তাই পেল সেবা করে।
অবস্থা গরীব বটে তাহে ক্ষতি নাই, ভিক্ষা করি সেবা করি আবশ্যকে পাই।
ঠাকুর আছেন পিছে মনে তাই বল, সকল কর্মেতে মাত্র ঠাকুর সম্বল।
ব্রহ্মপুত্র স্নান যোগে শত শত লোক, তাঁহাদের সেবা করি অন্তরে পুলক।
মাদারীপুর হতে লইয়া ভক্তগণ, ঠাকুরের কাছে তাঁরা করে আগমন।
ঠাকুরের মূর্তি তাঁরা করিয়া প্রতিষ্ঠা, কায়মনে সেবা করে রাখি অতি নিষ্ঠা।
একবার রাসযাত্রা যোগের সময়, দুই কুড়ি লোক ছিল তাহার নৌকায়।
শেষরাত্রে এসেছিল বাশুড়িয়া ধাম, তাহাতে বলেন প্রভু, "কি অন্যায় কাম?"
উত্তরে বলিছে তাঁরা, 'আছে যে কারণ, কুঞ্জ ডাক্তারের ভাই ত্যজিছে জীবন। "সেই শবে সৎকার অতি শীঘ্র করি, রওনা করেছি মোরা স্মরিয়া শ্রীহরি।
হেনকালে ভক্ত কুঞ্জ উপনীত হ'ল, কুঞ্জকে ধরিয়া প্রভু ঢলিয়া পড়িল।
ভাই মারা গেছে তারে শীঘ্র পোড়াইয়া,
আমার নিকটে এলে কি ধন লাগিয়া। পদে ধরি ভক্ত কুঞ্জ পড়িল ভূতলে,
উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে শুধু 'বাবা বাবা' বলে। 'কোটি কোটি জনমের বান্ধব আপনি',
কত যে আপন তাহা কিরূপে বাখানি। ঠাকুরের পরশেতে দিব্য দৃষ্টি পায়,
মায়া মোহ আধি ব্যাধি তার চলে যায়। সংসার বলিতে রাই সর্বস্ব তাহার,
রাই বিনা পৃথিবীতে হেরে অন্ধকার। নাম আর রূপ দোঁহে মোহিয়াছে তাঁরে,
কেমনে থাকিবে সেই গৃহের মাঝারে। উৎসবাদিতে যত আনন্দাদি হয়,
বর্ণিতে অক্ষম আমি বলা নাহি যায়। প্রেমের ঠাকুর যেথা থাকে বর্তমান,
সে লীলা বর্ণিবে হেন নাই শক্তিমান। সহস্র সহস্র ভক্ত হ'য় এক ঠাঁই,
সকলেই মাতোয়ারা প্রেমে ভজে রাই। ঈশ্বর প্রেমেতে কিবা আনন্দাদি হয়,
ভুক্তভোগী বিনা তাহা বোঝা বড় দায়। সুসজ্জিত আসরেতে ভক্তগণ মাঝে,
যে জন না ডুবিয়াছে তার জন্ম মিছে। যাত্রা-কবি-থিয়াটার-রামায়ণ গান,
শুনিয়ে লভয়ে শান্তি পুলকিত প্রাণ।
প্রেমানন্দে ঢেউ খেলে সকল সময়, আহার বিহার কথা সব ভুলে যায়।
এরূপ ঠাকুর লীলা চিন্ত সর্বক্ষণ, পবিত্র আনন্দ পাবে জুড়াবে জীবন।
ভক্তিমতী সুমতি ডাক্তারের বনিতা, অপুত্রক বটে মাত্র দুই কন্যা মাতা।
ভাই শোক বড় শোক পাসরিয়া বুকে, রামচন্দ্রে ছাড়াইয়া গেল কলিযুগে।
এইরূপে কত শিক্ষা জীবগণে দিতে,
দয়াল ঠাকুর এল এই ধরণীতে।
পুত্র নাই বলে কোন আফসোস নাই, দানের উপরে দাবী ছাড়ে সর্বদাই।
ছোট কন্যা মহামায়া সঙ্গেতেই ছিল, বাড়ি ফিরিবার কালে প্রভুকে বলিল।
'ভাই, আমাদের দেশে কোনদিন যাবে? দয়া করি সেই কথা এখনি কহিবে।'
ঠাকুর বলিছে, বাবা দীনহীনজন, সঙ্গে মোর লোক যাবে ষাট আশি জন।
বহুলোক যত্ন করা হবে বড় দায়, সেইজন্য আমাদের যাওয়া না হয়।
মহামায়া বলে দাদা ভুল কেন কও?
সকলের খাদ্য দ্রব্য তুমিইতো দেও।
আমিই সমস্ত করি কে বলে তোমাকে?
এই যে বলেছ কথা কত না আমাকে।
মহামায়া বলে, 'দাদা এও তুমি কও,
আমার প্রাণের মাঝে তুমি সদা রও।'
ঠাকুর বলিছে, 'তুমি ভিন্ন একজন,
তুমি আমি একজন বল কি কারণ?"
লক্ষদিয়া গলা ধরি পড়িল কাঁদিয়া,
তুমি আমি একজন দেখহ ভাবিয়া।
অদূরে দাঁড়ায়ে কুঞ্জ হেরিল তখন,
ক্ষণে রাই ক্ষণে মহামায়া একজন।
স্বরূপ দেখিয়া প্রভুর হারাল হুশ,
প্রভু বলে ভক্তগণে কুঞ্জই মানুষ।
অতঃপর কুঞ্জ ভক্ত দেশে ফিরে গেল,
প্রেমানন্দে দিনগুলি কাটিতে লাগিল। অলৌকিক প্রভু মায়া লয়ে মহামায়া,
বিবাহ কাহিনী বলি শোন মন দিয়া। কুঞ্জ ডাক্তারের হ'ল চিন্তাযুক্ত মন,
কার কাছে করি এবে কন্যা সমর্পণ। ঠাকুরের কাছে করে কাতর প্রার্থনা,
'কি করিব বাবা এবে বলে কি দিবেনা?" অবশেষে একদিন সূক্ষ্ম দেহে আসি,
রাই রসরাজ তাঁরে বলে মৃদু হাসি। আমি তারে বিয়া দিব তোমার কি দায়,
ও চিন্তা করোনা তুমি সকল সময়। সমাজে বিখ্যাত লোক তার নাম বলে,
কন্যা দান কর তাঁর পুত্রে অবহেলে। যে রাত্রিতে এইরূপ স্বপন দেখিল,
পরদিন সকালেতে সেদিক চলিল। সেই সে বিখ্যাত ব্যক্তি সেও তেমনি দেখে,
কুঞ্জের মেয়েকে আন বলি যে তোমাকে। সেজন হাঁটিছে ভোরে কুঞ্জের দিকেতে,
দুইজনে দেখা হ'ল পথের মাঝেতে। বিশেষতঃ ঠাকুরের আদেশ জানিয়া,
রসান লেগেছে মনে লীলাতে মজিয়া। পরস্পরে পথিমধ্যে যবে দেখা হ'ল,
আলিঙ্গনে বাঁধি দোঁহে কাঁদিতে লাগিল। কুঞ্জ বলে, 'দাদা তুমি কোনদিকে যাও?'
সেজন কহিছে, 'তুমি মোর কথা লও।'
রাত্রিতে দেখিনু আমি প্রেমের ঠাকুর, সেজন্য হাঁটিয়া আসি আজ এতদূর।
ঠাকুরের আদেশেতে যাব তব ঠাঁই, কন্যা তব পুত্র বধু আমি আজ চাই।
আমার যে পুত্র আছে বিবাহ যে দিব, সেইজন্য আমি তব কন্যা রত্ন নিব।
বলিছে কুঞ্জ ডাক্তার, 'কোন বাঁধা নাই', দয়া করে লও যদি আমি বেঁচে যাই।
ঠাকুর আমাকে অদ্য দিয়াছে আদেশ, তব পুত্রে কন্যা দিতে সেই তো নির্দেশ।
ঠাকুরের বিধানেতে বিবাহ হইল, আনন্দিত হইয়া তারা সংসার করিল।
যদি কেহ ভগবদ ভক্ত হয়ে থাকে, ধ্বংস নাহি হয় কভু পড়িয়া বিপাকে।
ভগবদ ভক্তি শক্তি নাহি পরিমাণ, বিধির কলম কাটি করে খান খান।
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে, কুঞ্জ ভক্ত প্রভু বাক্য রক্ষা মাত্র করে।
বহু বহু ভক্ত ডাকি আনিল এখানে, ঠাকুর দর্শনে শান্তি পেল বহু জনে।
রাই রসরাজ লীলা লেখা নাহি যায়, চরণে শরণ নিলে প্রেমধন পায়।
ভক্ত সঙ্গে রঙ্গরস প্রেমের পাথার, ভুলিতে পারেনা কেহ গেলে একবার।
রসরাজ লীলা কথা অমৃত সমান, কথনে প্রারব্ধ নাশ শুনে পুণ্যবান।
পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন


0 Comments