পর্ব ৪৩: শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ও আত্মজ্যোতির লীনতা
যুগের পর যুগ ধরে শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন ধর্ম, প্রেম, এবং লীলার প্রতীক। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ, দ্বারকার প্রতিষ্ঠা, যাদব বংশের উত্থান ও পতনের পর অবশেষে সেই মহাপুরুষ নিজেই প্রস্তুত হন আত্মত্যাগের জন্য। এই পর্বে আমরা জানব, কিভাবে শ্রীকৃষ্ণ নিজের জীবনচক্র শেষ করেন এবং কীভাবে তাঁর আত্মজ্যোতি লীন হয় অনন্তে।
শ্রীকৃষ্ণের নীরব বিচরণ
যাদব বংশের ধ্বংস এবং বলরামের মহাপ্রয়াণের পর, শ্রীকৃষ্ণ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, এই পৃথিবীতে তাঁর ভূমিকা শেষ। দ্বারকার সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়া, নিজের প্রিয় ভাই ও সন্তানদের হারানো—সবই ছিল লীলার অংশ।
তিনি নির্জন এক বনে, প্রভাস তীর্থে চলে যান। তাঁর চোখে তখন আর কোনো রাজসিকতা নেই, নেই কোনো ঐশ্বর্যের আকর্ষণ। তিনি যেন এক ধ্যানস্থ ঋষির মতো প্রকৃতির মাঝে বিলীন হতে চাইছেন।
শিকারি জরা ও ভাগ্যের পরিণতি
একদিন শ্রীকৃষ্ণ একটি পিপল গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় জরা নামক এক শিকারি এসে পড়ে তাঁর কাছে। দূর থেকে দেখে, শ্রীকৃষ্ণের পদতলের রঙিন আভা ও গহন গৃহস্থ পোশাক দেখে ভুল করে তাঁকে হরিণ মনে করে।
সে একটি বিষাক্ত বাণ ছোঁড়ে, যা শ্রীকৃষ্ণের পদে বিদ্ধ হয়। যন্ত্রণায় শ্রীকৃষ্ণ হালকা কষ্ট পান, কিন্তু রেগে যান না। বরং শান্ত স্বরে জরাকে বলেন—
“ভয় পেয়ো না। তুমি আমার লীলার মাধ্যম মাত্র। পূর্বজন্মে আমি রামরূপে বালীকে পেছন থেকে বাণে আঘাত করেছিলাম। আজ সেই কর্মফলের প্রতিফলন।”
জরা কাঁদতে থাকে এবং পায়ে পড়ে ক্ষমা চায়। শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশীর্বাদ দেন এবং মুক্তি প্রদান করেন।
আত্মজ্যোতির লীনতা
শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে দেহত্যাগ করেন। তবে তাঁর দেহ সাধারণ মানুষের মতো ছিল না। তিনি স্বয়ং পরমাত্মা—তাঁর তেজ, তাঁর জ্যোতি ছিল অমল ও অসীম।
শাস্ত্র অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের দেহ তখন এক আলো রূপে রূপান্তরিত হয় এবং তিনি আত্মজ্যোতিরূপে ভগবতের সাথে মিলিত হন।
যদিও মানবরূপে তাঁর দেহ প্রস্থান করে, কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তাঁর ভাব, ও তাঁর লীলা চিরন্তন হয়ে থাকে।
দ্বারকার মানুষদের পরিণতি
যাদব বংশ ও দ্বারকার পতনের পর, যারা বেঁচে ছিলেন—তাদের মধ্যে কিছু পুরুষ ও নারী শ্রীবল্লভ ও বভ্রুদের সঙ্গে হস্তিনাপুরে চলে যান। অরিজুন নিজ হাতে তাঁদের রক্ষা করেন এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে আবার তাঁদের পুনর্বাসন করেন।
দ্বারকা তখন সম্পূর্ণই সমুদ্রের তলায় তলিয়ে যায়।
ইতিহাস নাকি লীলা?
শ্রীকৃষ্ণের প্রস্থান নিয়ে বহু তর্ক ও ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ বলেন, এটা ইতিহাস। কেউ বলেন, এটা ঈশ্বরীয় লীলা। কিন্তু যেটাই হোক না কেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়ে দেন—
"এই সংসারে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু ধর্ম, প্রেম ও সত্য—এই তিন চিরন্তন।"
শ্রীকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ শুধু একজন পুরুষের মৃত্যু নয়, বরং এক যুগের অবসান। দ্বাপর যুগের শেষ এবং কলিযুগের সূচনা—এই এক মুহূর্তে ঘটে যায়। তাঁর চলে যাওয়া আমাদের শেখায় আত্মত্যাগ, কর্মফল, ও ঈশ্বরীয় পরিকল্পনার গভীরতা।
শেষ পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন জয় রাধা কৃষ্ণের জয়।

0 Comments