কূম্ভ অবতার


 

পর্ব ৫


কূম্ভ অবতার সমুদ্র মন্থনের কাহিনী

বিষ্ণু দেবতা যুগে যুগে অবতীর্ণ হন ভক্তদের রক্ষা করতে ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য। তাঁর দশ অবতারের মধ্যে দ্বিতীয় অবতার হলো কূর্ম অবতার, অর্থাৎ কচ্ছপ রূপ
এই অবতার মূলত সমুদ্র মন্থনের মহাকাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। এখানে দেবতা ও অসুর একসাথে সমুদ্র মন্থন করেছিলেন, যার ফলস্বরূপ বহু মহাদেবীয় বস্তু প্রকাশ পায়।

কিন্তু এই বিশাল সমুদ্র মন্থন হতো না যদি বিষ্ণু কচ্ছপ রূপে না আসতেন। তাই কূর্ম অবতারকে হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ধরা হয়

দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব

একসময় দেবতারা তাদের শক্তি হারিয়ে ফেললেন। অসুরদের হাতে তারা বারবার পরাজিত হতে লাগলেন। দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ংও দুর্বল হয়ে পড়লেন।

বিষ্ণুর কাছে দেবতারা আশ্রয় নিলেন। তিনি পরামর্শ দিলেন

  • অমৃত লাভ না করলে তোমাদের শক্তি ফিরে আসবে না। তাই অমৃতের জন্য সমুদ্র মন্থন করতে হবে।
অমৃত অর্থাৎ অমরত্বের রস। এটি পাওয়ার জন্য দেবতাদের একা সমুদ্র মন্থন করা সম্ভব ছিল না। তাই তাদের অসুরদের সঙ্গেও সমঝোতা করতে হলো।

সমুদ্র মন্থনের প্রস্তুতি
  • মন্দর পর্বত ব্যবহার করা হলো মন্থনদণ্ড হিসেবে।
  • বাসুকি নাগরাজকে ব্যবহার করা হলো দড়ি হিসেবে।
  • দেবতা ও অসুর উভয়েই দড়ির দুই প্রান্ত ধরে টানতে লাগলেন।
কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হলো। মন্দর পর্বত ছিল বিশাল ও ভারী। মন্থন শুরু হতেই সেটি সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেল।

বিষ্ণুর কূর্ম অবতার প্রকাশ

যখন মন্থন থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো, তখন দেবতারা বিষ্ণুর কাছে প্রার্থনা করলেন।
বিষ্ণু বিশাল কূর্ম রূপে (কচ্ছপ অবতার) প্রকাশ পেলেন এবং সমুদ্রের তলায় গিয়ে মন্দর পর্বতকে নিজের পিঠে স্থাপন করলেন।

এইভাবে তিনি সমুদ্র মন্থনের ভিত্তি স্থির করে দিলেন।

তাঁর বিশালাকার কচ্ছপ পিঠে দাঁড়িয়েই দেবতা ও অসুররা মন্থন চালিয়ে যেতে পারলেন।

সমুদ্র মন্থন থেকে উৎপন্ন বস্তু

মন্থনের ফলে একে একে বহু আশ্চর্য বস্তু প্রকাশ পেল

  1. হালাহল বিষ – যা সমুদ্র থেকে প্রথম বের হয়। শিব মহাদেব তা পান করে গলায় ধারণ করেন, ফলে তিনি নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন।

  2. কমধেনু গাভী – যা অক্ষয় সম্পদের প্রতীক।

  3. ঔষধি ও রত্ন – বহু মূল্যবান রত্ন ও ভেষজ বের হয়।

  4. ঐরাবত হাতি – দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন হিসেবে প্রকাশ পায়।

  5. লক্ষ্মী দেবী – সমুদ্র মন্থনের ফলেই মহালক্ষ্মীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি পরে বিষ্ণুর পত্নী হন।

  6. ধন্বন্তরী – অমৃত কুম্ভ হাতে নিয়ে সমুদ্র থেকে উদয় হন।

  7. অমৃত কুম্ভ – মন্থনের প্রধান উদ্দেশ্য।


অমৃত কুম্ভ নিয়ে দ্বন্দ্ব

যখন অমৃত বের হলো, তখন অসুররা সেটি দখল করে নিল। দেবতারা হতাশ হয়ে পড়লেন।
ঠিক তখনই বিষ্ণু এক আশ্চর্য রূপ ধারণ করলেন মোহিনী অবতার। তিনি অসুরদের মোহিত করে দেবতাদের হাতে অমৃত তুলে দিলেন।

ফলে দেবতারা অমৃত পান করে অমরত্ব পেলেন, আর অসুররা আবার পরাজিত হলো।

বিষ্ণুর কূর্ম অবতার আমাদের শেখায়

  • জীবনের ভিত্তি স্থির ও শক্তিশালী রাখতে হবে।
  • ধৈর্য, ভক্তি ও ঐক্যের মাধ্যমে বড় কাজ সম্পন্ন হয়।
  • অসুরশক্তি যতই প্রলয় আনুক, ঈশ্বর সবসময় ধর্মের রক্ষা করেন।
পরবর্তী পর্বে আমরা জানবো
  • বরাহ অবতার – পৃথিবী উদ্ধারের কাহিনী

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Post a Comment

0 Comments