পর্ব ৪
হিরণ্যকশিপুর চরম অত্যাচার ও বিষ্ণুর অবতার গ্রহণের প্রস্তুতি
ভূমিকা
পূর্ববর্তী পর্বে আমরা দেখেছি ভক্ত প্রহ্লাদ কীভাবে তার পিতা হিরণ্যকশিপুরের নির্যাতনের মধ্যেও ভগবান বিষ্ণুর প্রতি অটল ভক্তি ধরে রেখেছিল। এবার আমরা দেখব, হিরণ্যকশিপুর তার অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভে কতদূর গিয়ে প্রহ্লাদকে শেষ করতে চেয়েছিল এবং কীভাবে এই অন্যায় অত্যাচারের প্রতিকারে বিষ্ণু প্রস্তুত হচ্ছিলেন নৃসিংহ রূপে আবির্ভূত হওয়ার জন্য।
হিরণ্যকশিপুরের দম্ভ ও অহংকারের চূড়ান্ত রূপ
দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু তার তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মার কাছ থেকে এমন একটি বর পেয়েছিল, যা তাকে কার্যত অমর করে তুলেছিল। সে চেয়েছিল:
- সে যেন কোন মানুষ, দেবতা বা পশুর দ্বারা মারা না যায়,
- দিনে না রাতে,
- ভিতরে না বাইরে,
- স্থলে না আকাশে,
- কোন অস্ত্র বা শস্ত্র দিয়ে নয়।
চরম অত্যাচার: প্রহ্লাদকে হত্যার নৃশংস চেষ্টা
হিরণ্যকশিপুরের ক্রোধ দিনে দিনে বেড়েই চলছিল। সে বুঝতে পারছিল না কীভাবে তার নিজের পুত্র বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে। এরপর সে আরও ভয়ানক ও নৃশংস পন্থায় প্রহ্লাদকে হত্যার চেষ্টা করে:
হাতির পদতলে পিষে ফেলার চেষ্টা
হিরণ্যকশিপুর এক বিশাল উগ্র হাতিকে আনে, প্রহ্লাদকে তার পায়ের নিচে ফেলে দেয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার—হাতিটি প্রহ্লাদকে আঘাত না করে তার পা চেটে দিতে থাকে। সকলে বিস্মিত।
উঁচু পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া
প্রহ্লাদকে একটি উঁচু পাহাড়ের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে থেকে তাকে নিচে ঠেলে ফেলা হয়। কিন্তু সে পতনের সময়ই অদৃশ্য হাতে ধরে রাখা হয় — সে অক্ষত থাকে।
বিষ খাইয়ে হত্যা
তার খাবারে বিষ মেশানো হয়। কিন্তু প্রহ্লাদ সেই খাবার ঈশ্বরের নামে ভোগ স্বরূপ গ্রহণ করে এবং কিছুই হয় না।
দুষ্ট পিশাচ ও রাক্ষস দ্বারা হত্যা
তান্ত্রিকদের ডেকে আনা হয়, যারা পিশাচ, ভূত, দানবকে ডেকে প্রহ্লাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। কিন্তু তার ভগবদনাম উচ্চারণে সব আত্মা পালিয়ে যায়।
হলিকা দহন: প্রহ্লাদ রক্ষা পায়, অন্যায় পুড়ে যায়
হিরণ্যকশিপুরের বোন হোলিকা ছিল এমন এক অসুরী, যার এক বর ছিল— সে আগুনে পোড়বে না। হোলিকাকে আদেশ দেওয়া হয় প্রহ্লাদকে কোলে বসিয়ে আগুনে প্রবেশ করতে।
তারা আগুনে বসে, আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু হোলিকা পুড়ে যায়, আর প্রহ্লাদ অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে। কেন?
- কারণ হোলিকা সেই বর ব্যবহার করেছিল অন্যায় উদ্দেশ্যে।
- আর প্রহ্লাদ ছিল ভক্ত, সত্য ও ধর্মের প্রতিনিধি।
বিষ্ণুর প্রস্তুতি: নৃসিংহ রূপে আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে আসে
হিরণ্যকশিপুর যখন প্রহ্লাদকে রাজসভায় এনে প্রশ্ন করল — "তোর ঈশ্বর কোথায়? তিনি তো সবজায়গায় আছেন বলিস — তবে এই স্তম্ভেও আছেন?"
প্রহ্লাদ উত্তর দিল, “হ্যাঁ, তিনি সর্বত্রই আছেন — এই স্তম্ভেও।”
রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে হিরণ্যকশিপুর তার গদা দিয়ে সেই স্তম্ভে আঘাত করে। মুহূর্তেই স্তম্ভ ফেটে বেরিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর, অলৌকিক রূপ—নর এবং সিংহের মিশ্র রূপে ভগবান বিষ্ণু — নৃসিংহ অবতার।
উপসংহার
এই পর্বে আমরা দেখলাম —
প্রহ্লাদের ভক্তির সামনে হিরণ্যকশিপুরের সব অত্যাচার ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, অবিচল ভক্তির ডাকে শেষ পর্যন্ত ঈশ্বর নিজেই আবির্ভূত হন।
পরবর্তী পর্বে আমরা জানব নৃসিংহ অবতারের সেই ভয়ঙ্কর রূপ ও কীভাবে তিনি হিরণ্যকশিপুরকে ধ্বংস করে ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

0 Comments