নর নারায়ণ লীলা ও অযাচিত কৃপা: রাইচাঁদ ঠাকুরের অলৌকিক ভক্তির ইতিহাস


 নর নারায়ণ লীলা

পর্ব 15

জয় জয় রাইচাঁদ ভক্তের জীবন, ভক্ত সঙ্গে লীলা খেলা কর অনুক্ষণ।
বারে বারে এসে তাই অবনী মাঝারে, রস আস্বাদন তব বাসনা অন্তরে।
এইবার জন্ম নিয়া চুবনের ঘরে, রসরাজ রসসিন্ধু বিলাবার তরে।
ঘাগরী উদরে জন্ম মানুষ রতন, সময়েতে জানিবেক যত ভক্তগণ।
জীবের দুর্গতি তুমি কর দরশন, অন্ধকারে নিপতীত নর নারীগণ।
পথের সন্ধান দিতে নিজে ভগবান, নররূপে অবতারী করে আগমন।
নদীরাম ভক্ত অতি বিজ্ঞ চূড়ামণি, তাহার মহিমাগুণ কিরূপে বাখানি।
ওড়াকান্দি ঠাকুরের ভক্ত একজন, সেখানেতে যাতায়াত করে সর্বক্ষণ।
একদিন ওড়াকান্দি হতে আসিতেছে, বাশুড়িয়া আশ্রমের নিকট পৌছিছে।
ঠাকুর ছিলেন একা দাঁড়ায়ে তখন, বট বৃক্ষ তলে দেখা নর নারায়ণ।
অপরূপ রূপ তাঁর বিশ্ব বিমোহন, দর্শনে মোহিত হ'ল নদীরাম মন।
আমি যেই হরিচাঁদে করি আরাধনা, প্রাণের ঠাকুর এই করি বিবেচনা।
ত্রৈলক্ষ্যের জ্যেষ্ঠ ভাই এই নদীরাম, হরিনাম করি ফেরে সদা অবিরাম।
নদীরাম বলে ভাই আমার বাসনা, ঠাকুরের কাছে গিয়া পূরাও কামনা।
মনুষ্য দুর্লভ জন্ম ভুবন মণ্ডলে, বিফলেতে যাবে চলে যদি থাকি ভুলে।
জ্যেষ্ঠের আদেশ মানি ত্রৈলক্ষ্য তখন, ঠাকুরের নিকটেতে করে আগমন। পথে বসি মনে ভাবে আমি অভাজন,
কেমনে করিব জ্যেষ্ঠের ইচ্ছা পূরণ। গণেশ কনিষ্ঠ ভ্রাতা রোগ হ'ল তার, সান্নিপাত জ্বরে তার হইল বিকার।
নিরাময় নাহি হয় হ'ল মৃত প্রায়,
ঠাকুরের কাছে গিয়া অবস্থা জানায়। শুনিয়া ঠাকুর দিলেন এক মুষ্টিযোগ,
তাহাতেই সুস্থ হ'ল গেল রোগ ভোগ। গণেশের শেষে মন হইল এমন,
দিবানিশি করে শুধু ঠাকুর স্মরণ। মনের মানুষ পেয়ে হয়ে আনন্দিত,
সেবা করে তিন ভাই সদা অবিরত। বাড়িতে ঠাকুর মূর্তি করিল স্থাপন,
স্মরণ মননে তাঁরা থাকে সর্বক্ষণ। রাই রসরাজ লীলা অমৃত সমান,
আনন্দেতে করে পান যত ভাগ্যবান।



অযাচিত কৃপা লীলা


জয় জয় রাইচাঁদ রসিক শেখর,
জয় জয় রাই ভক্ত শ্রীনকুলেশ্বর।
সুমধুর কণ্ঠ যাঁর কৃষ্ণ গুণ গানে,
 ভাগ্যবস্তু সুগায়ক যাহাকে বাখানে। ঠাকুরের সহ তাঁর ক্ষণেকের লীলা,
শ্রবণে জীবের মুক্তি গলে যায় শিলা। নকুল জন্মিয়াছিল বাহিরভাগেতে,
 ক্ষণ জন্মা শুদ্ধ চিত্ত কায়স্থ কুলেতে। ছিল সে পরম ভক্ত মহা গুণবান,
অন্যতম অনুরাগী বৈষ্ণব ধীমান। মহারোগে ভুগিতেছে নকুল যখন,
 গোপালগঞ্জেতে এল ব্যবসা কারণ। কাঠের আড়তে থাকে যথা কার্যরত,
হইতেছে চিকিৎসা যথা বিধিমত।
নিরাময় নাহি হয় ক্রমে ক্রমে ক্ষীণ, হতাশ হইয়া শেষে গনিতেছে দিন।
মৃত্যু পথযাত্রী সে শুইয়া রয়েছে, শেষরাত্রে সুমধুর কীর্তন শুনেছে।
বহু ভক্ত এক সঙ্গে নাম গান গায়, অশ্রুধারা তাঁহাদের বয়ান ভাসায়।
অইরূপ হরিনাম কতই শুনেছে, আজ কিন্তু শুনি নাম হরষে মেতেছে।
মশারী ভিতরে শুয়ে সেই গান শুনে, বিমোহিত হয়ে এল ভাবান্তর প্রাণে।
মশারী ছিড়িয়া শেষে বাহির হইল, কীর্তনের সঙ্গে গিয়া কীর্তন করিল।
জয় রাধা কৃষ্ণ নাম করিতেছে সবে, দিশেহারা হয়ে গেল নামের প্রভাবে। করিতে করিতে গান পাঁচুড়িয়া এল,
আশ্রমে প্রভুর সনে সাক্ষাৎ হইল। ঠাকুর বলেন, 'শুন ঘোষ মহাশয়, গান শুনাইয়া সুখী কর হে আমায়।'
নকুল বলিছে, আমি ভাল নাহি গাই, আপনার কথামাত্র রাখিবারে চাই।
নকুলের মনে আজ প্রেমানন্দ আছে, গান গাহিতে তাঁহার হৃদয় নাচিছে।
অশ্রুসিক্ত অবস্থায় গান গেয়েছিল, ঠাকুর শুনিয়া বড় আনন্দ পাইল।
ঠাকুর বলিছে, 'তুমি আরও শুনাও,
ভাবিছে নকুল মনে তুমি যাহা কও।' ক্রমে ক্রমে তিন গান গাহিয়া শুনাল,
ঠাকুর বলিছে, 'প্রাণ তৃপ্তি নাহি হ'ল।'
সতীশ মিত্র তথায় ছিল উপস্থিত, বলিতে লাগিল তিনি, 'ইহা অনুচিত।'
পূর্বের অধ্যায়ে আছে মিত্রের কাহিনী, সতী সাধ্বী পয়ঃমন্ত যাঁহার গৃহিণী।
ভক্তসহ ঠাকুরের যত লীলা খেলা, জানীমাত্র বুঝে তাহা অকূলের ভেলা।
মায়ামোহ অন্ধকারে তাহারাও ঘোরে, ভ্রান্তিতে মজিয়া জীবে ঠাকুরে বিচারে?
মহাবিজ্ঞ মিত্র ভক্ত ক্ষণিকের ভুলে, ১১ হাস্যস্পদ হলো দেখ ভক্ত সভাস্থলে।
সতীশ বলিছে, 'ওর আছে যক্ষ্মা রোগ, অতিরিক্ত সঙ্গীতেতে বাড়িবে দুর্ভোগ।' এত যদি বলে মিত্র শুনিয়া ঠাকুর,
রাগান্বিত হয়ে বলে মন্দ যে প্রচুর। আরে রে অন্ধের বেটা বুদ্ধি নাই মোটে,
ঈশ্বরের নাম গানে ব্যাধি নাকি ঘটে? রাত্রি দিন গাবে গান মোর সঙ্গে থাকি,
কিভাবেতে রোগ বাড়ে আমি তাহা দেখি? একই সময় বহু নাম করা হলে,
গলাদিয়া রক্ত পড়ে কেবা তাহা বলে। আমার সঙ্গেতে যাক ভ্রমণে এখন,
ভাবের বাতাসে রোগ থাকে কতক্ষণ। রাত্রিদিন গাবে গান যদি রোগ হয়,
কৈফিয়ৎ দিব আমি জানিবে নিশ্চয়। ঠাকুরের বাক্য শুনি নকুলের মন,
দ্রবীভূত হয়ে গেল ভাবিছে তখন। জানা নাই শোনা নাই প্রথম দর্শনে,
এত ভালবাসে যেবা করয়ে আপনে। এমন দয়াল প্রভু যদি আমি পাই,
সর্ব কর্ম পরিহরি র'ব তাঁর ঠাঁই। মরণ সঙ্কল্প করি এখানেতে আসি, রোগ ভোগ যদি যায় প্রভু ভালবাসি।
এখান থেকে আমি আর নাহি যাব, যেভাবে রাখেন তিনি তাহা মেনে লব।
এই চিন্তা করি মনে আশ্রমেতে র'ল, আড়তের চাবিগুলি তাঁর কাছে ছিল।
খরিদ্দার এসে শেষে ফিরিতে লাগিল, মহাজন নকুলের তালাসে আসিল।
আশ্রমেতে আসিয়া পায় তাঁহার সন্ধান, গালাগালি দেয় কত নাহি কাণ্ডজ্ঞান।
জবাব নকুলে দিয়া চাবি লয়ে গেল, মুক্ত হয়ে একান্তেতে শ্রীপদে রহিল।
পরদিন ঠাকুরের মনেতে ইচ্ছিল, দক্ষিণ দেশেতে প্রভু রওনা করিল।
ভক্তগণ বাড়ি যায় ঠাকুর যখন, সে দৃশ্য দেখিয়া প্রেম লভে সর্বজন।
ভক্তিমতী নারী যাঁরা পাগলিনী প্রায়, দিশাহারা হয়ে তারা ভূমিতে লোটায়।
অশ্রু সিক্ত হয়ে তারা করে হায় হায়, পরম রতন পেয়ে চৈতন্য হারায়।
এত সব দেখি ঘোষ মানিল বিস্ময়, সাধারণ নহে ঠাকুর ঈশ্বর নিশ্চয়।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে সেই ভাগ্যবান জীব, অযাচিত কৃপা পেয়ে হইল সজীব।
ভ্রমণ করিল দিন পনের ঠাকুর, এর মাঝে নকুলের হ'ল প্রেমাঙ্কুর। আশ্রমে ফিরিয়া আসে নিরাময় হ'ল,
সুস্থ দেহে শক্তি পেল উপসর্গ গেল।
সেই হতে তাহার মন শুদ্ধ হইল,
প্রাণের ঠাকুর পেয়ে আনন্দ বাড়িল। যেখানে ঠাকুর যায় সেখানে নকুল, স্মরণ মননে তাঁর নাহি পড়ে ভুল।
কিছুদিন এইভাবে করি অবস্থান, ঠাকুরের সঙ্গে সদা নাহি ব্যবধান।
ভ্রমিয়া প্রভুর সঙ্গে দিন কেটে যায়, প্রেমানন্দ সাগরেতে সাঁতার কাটায়।
একদিন আশ্রমেতে প্রভু নাহি ছিল, এমন সময় তথা ত্রিব্যক্তি আসিল।
ঢাকা জেলা হতে তাঁরা এখানে এসেছে, রাত্রিতে থাকিবে মনে বাসনা রয়েছে।
নকুলের কাছে স্থান প্রার্থনা করিল,
ঠাকুরের অপেক্ষায় থাকিতে বলিল। আশ্রমেতে এল প্রভু সন্ধ্যার সময়,
তাহাদের তরে তিনি প্রার্থনা জানায়। ঠাকুর বলিছে, 'শুন মহাশয়গণ,
অন্যত্র যাইয়া কর রাত্রিটা যাপন।' নকুল পাইল দুঃখ অতিশয় ভারী,
অজ্ঞান অবোধ আমি কি করিতে পারি। দুঃখিত হইয়া নকুল রহিল শুইয়া,
পরদিন আদেশিলা ঠাকুর আসিয়া।
'ঘোষ মহাশয়, তুমি পাঁচুড়িয়া যাও,
দুই চারিদিন তুমি সেখানেতে রও।' প্রভুর আদেশ মত পাঁচুড়িয়া যায়,
যশোহর জেলাবাসী পান্থের উদয়।
তাহারা বলিছে, মোরা এখানেতে থাকি',
নকুল বলিছে, 'তাহে বাঁধার আছে কি।' সেইরাত্রি তিনজন আশ্রমেতে রয়,
আরম্ভ হইল নাম সন্ধ্যার সময়। কীর্তনাদি শুনে তারা আনন্দিত হ'ল,
একত্রে সকলে মিলি খাইতে চলিল। আশ্রমেতে ছিল এক সুন্দরী কামিনী,
 অপূর্ব রূপসী বালা নামেতে রোহিনী।
অঙ্গ হতে জ্যোতি তাঁর বাহির হতেছে, তাহারা মোহিত হ'ল যখন দেখেছে। তাহারা বলিছে, 'শুন ঘোষ মহাশয়, এই মেয়ে পরিচয়ে কিবা তব হয়?'
নকুল বলিছে, 'মোর কিছু নাহি হয়, গোসাঁই বংশের মেয়ে এই পরিচয়।'
ঠাকুরের ভাবে ডুবে এখানেতে থাকে, বিভিন্ন স্থানেতে জন্ম কি বলিব কাকে।
এই কথা শুনে তারা মৌনভাবে রয়, প্রাতঃকালে উঠে তারা যাত্রা করে যায়।
ব্রাহ্মণের বাটী এক নিকটে রয়েছে, তামাক খাইতে তারা সে বাড়ি গিয়াছে।
ব্রাহ্মণের কাছে তারা বলিছে হাসিয়া, অসতেরা থাকে কেন আশ্রম করিয়া।
নানাদেশী নর-নারী একস্থানে থাকি, সমাজে দেখায় তারা ভগবানে ডাকি।
পবিত্র ভাবেতে এরা থাকিতে পারে না, আমরা সবাই ইহা করি বিবেচনা।
বাণীকণ্ঠ পুত্র সেই ব্রাহ্মণ যামিনী, আশ্রমে আসিয়া বলে করি কানাকানি।
ঘোষ মহাশয় আমি তোমাকে জানাই, বহিরঙ্গ জনে কভু স্থান দিতে নাই।
এক সন্ধা অনাহারে কিছুই না হতো,
বৈষ্ণব নিন্দায় ধ্বংশ জনমের মত। কথার প্রসঙ্গে কর্তা বলেছে সবায়,
হাটুরে মামলাবাজে না দিবে আশ্রয়।
সাধু গুরু বৈষ্ণবের তরে সেবাশ্রম,
যাহাতে সাধিত হয় উদ্দেশ্য পরম।
এতেক শুনিয়া ঘোষ হ'ল দুঃখিত, 'ভালমন্দ না বুঝিয়া হ'ল মর্মাহত।
বর্ষাকাল সমাগত হইল যখন, ৬৮ ঠাকুর বাহির ভাগ করিল গমন। ঠাকুরের পানসীতে ভক্তগণ ছিল,
তাঁহাদের দেখিবারে নর-নারী এল। সারারাত্রি তারা সবে করিল কীর্তন,
ঠাকুরে পাইল যেন অমূল্য রতন। তথা হতে ভক্তগণ ফিরে আশ্রমেতে,
 কিছুদিন র'ল ঘোষ আপন বাড়িতে। হেনকালে এক সাধু ভোলানাথ নাম,
বাহির ভাগেতে এল রোগ দেখা কাম। পান্তাভাত চাল জল দিয়া রোগ সারে,
অঞ্চলের লোক যত সেই পাছ ধরে। নকুল ঘোষেরে ডাকি যেই কথা কয়,
সেই সব চিন্তায় যে ব্যথিত হৃদয়। ভোলানাথ ভুলাইল নকুলের মন,
সেই হতে তার সঙ্গে ঘোরে অনুক্ষণ। ভোলানাথের উপাধি পাগল হয়েছে,
সিদ্ধযোগী বলি তারে সকলে ডাকিছে। দুধ কলা সেবা করে নকুল যখন,
নিজের হাতেতে কভু না করে ভক্ষণ। মেয়ে লোক যত থাকে ভুঞ্জাইয়া দেয়,
ভোলানাথ সঙ্গে যায় যেখানেতে নেয়। প্রেত সিদ্ধ ভোলানাথ সব কিছু বলে,
সধারণে বশীভূত করিল কৌশলে। নকুল বিষম জ্বরে আক্রান্ত হইল,
মুষ্টিযোগ খেয়ে তাঁর রোগ না সারিল। ভূত সিদ্ধ প্রেত সিদ্ধ কত লোক আছে,
বলিয়া মনের কথা জ্বালা দেয় পিছে। আশ্রমেতে থাকি প্রভু করে আলোচনা,
অপদার্থ ভূত তোরে আমি ছাড়িব না।
যাঁর গায়ে হাত আমি দিছি একবার, তাঁরে ভুলাইয়া নিবি সাধ্য কি তোমার?
যষ্ঠি দিয়া মৃত্তিকাতে আঘাত করয়, এইরূপ করি ভূত তাড়াইয়া দেয়।
ওদিকেতে নকুলের ব্যাধি যে বাড়িল, মৃত্যুর লক্ষণ তাঁর আসি দেখা দিল।
যত সব ভদ্রলোক ছিল সে গ্রামেতে, তাহাদের ইচ্ছা হ'ল চিকিৎসা করিতে।
সকলে আসিয়া বলে নকুলের ঠাঁই, তব রোগ চিকিৎসা করিবার চাই।
নকুল বলিছে অদ্য কিছু না বলিব, কল্য ভোরে অবশ্যই মনস্থ জানাব।
নকুল ঠাকুরে স্মরি করিছে ক্রন্দন, নিজ গুণে দেখা দেও পতীত পাবন।
না জানি ভজন তাহে না করি পূজন, প্রতিষ্ঠা শূকরী বিষ্ঠা অঙ্গের ভূষণ।
তোমার চরণ ভুলি বিপথে যাইয়া, বিপদ শঙ্কুলে এবে গিয়াছি ডুবিয়া।
করিয়াছি অপরাধ ক্ষম দয়া করি, নিজগুণে রক্ষ প্রভু দয়াল শ্রীহরি।
রাত্রিতে শুইয়া তাঁর কেঁদে ওঠে প্রাণ, রাইচাঁদ নিজ গুণে কর মোর ত্রাণ।
তুমি ছাড়া এ জগতে কেহ মোর নাই, বিপদকালের বন্ধু কোথা র'লে রাই।
'হা রাই,' 'হা রাই' বলি বক্ষ ভাসিতেছে,
রাইচাঁদ শোয় যেন আসি তাঁর কাছে। ঠাকুরের অঙ্গ স্পর্শে শীতল হইল,
রাত্রি মধ্যে ব্যাধি তার সব সেরে গেল।
অতঃপর পাঁচুড়িয়া আশ্রমে আসিল, ঠাকুরের পদে এসে আশ্রয় লইল।
ঠাকুরের সঙ্গে ফেরে কীর্তন করিয়া, সকলে আনন্দ পায় সে গান শুনিয়া।
সুরসিক কীর্তনীয়া বলে খ্যাত ছিল,
তাহার তুলনা আর কিবা দিব বল।
হাসিতে হাসিতে গায় করিয়া রচনা,
শুনিলে আনন্দ বাড়ে মধুর রসনা।
একদিন মহোৎসবে গায় হাসি হাসি,
ভাত খেয়ে যা ডালনিয়া যা আয়রে নগরবাসী।
শুনি সে মধুর গান সবে দেয় তালি,
পরশ মনির স্পর্শে গেছে তাঁর কালী।
বিশেষ উন্নত ভক্ত ঘোষ মহাশয়,
নাম গান কীর্তনেতে ভাবের উদয়।
অবশেষে নবদ্বীপে নামযজ্ঞ হয়, সেই নামযজ্ঞে তিনি ম্যানেজার হয়।
নাম শুনি তাঁর মুখে নবদ্বীপ বাসী,
ভক্তিতে নোয়ায় শির কৃপার প্রত্যাশী।
সাধন তত্ত্বের কথা কেহনা জিজ্ঞাসে,
'সাধু সাধু' বলে তাঁরে সকলে সম্ভাষে। নবদ্বীপবাসী যত পণ্ডিতেরগণ,
নকুলে জিজ্ঞাসা করে, 'কহ বিবরণ।
দীক্ষাগুরু বল কেবা সেই মহাশয়, শুনিয়া আনন্দ পাই তার পরিচয়।'
নকুল বলিছে, 'মোর দীক্ষা শিক্ষা নাই,
রাইচাঁদ দয়া করি পদে দিছে ঠাঁই।'
শুনিয়া সকলে ভাবে হইয়াছে ভুল,
অনিত্য আনন্দ এযে বড় নামাজুল।
এতদিন নাম শুনি যে আনন্দ পাই,
অন্যায় করেছি মোরা এবে বুঝি তাই।
অবৈষ্ণব মুখে নাম শুনিতে যে নাই,
শাস্ত্রে ইহা যুক্তি আছে তোমাকে জানাই।
উপযুক্ত গুরু কর এখানেতে আছে, দীক্ষীমন্ত্র লও তুমি সেই গুরুর কাছে।
নকুল বলিছে, 'আমি না শুনে পারিনা, বিলম্বেতে ছাড়া কভু এ কাজ হবে না।'
ঠাকুরের কাছে তিনি চিঠি পাঠাইল, অন্তর্যামী মহাপ্রভু ইহা অবগত ছিল।
ঠাকুর দিলেন পত্র নকুলের ঠাঁই, 'যারা বলে দীক্ষা নিতে তাহাদের চাই।'
দিন তারিখ পাঠায়ে রওনা হইল, নবদ্বীপ ধামে গিয়া দরশন দিল।
রাষ্ট্র হ'ল ঠাকুরের ধামে আগমন, জানিতে বাসনা চিতে পণ্ডিতেরগণ।
পণ্ডিতেরা এক ঠাঁই সম্মিলিত হয়ে, ঠাকুরের কাছে গেল সকলে মিলিয়ে।
তাদের দেখিয়া প্রভু বলিছে তখন, 'দীক্ষা গ্রহণেতে কিবা আছে প্রয়োজন?'
মহাপ্রভু বলিয়াছে দীক্ষাতে কি আছে, ভাব হলে লাভ হবে আর সব মিছে।
ঠাকুর বলিছে, 'শুন জ্ঞানী মহাজন, জমির অবস্থা কিছু জানা প্রয়োজন।'
জলে গেছে জমি ভেসে বীজ বুনি কিসে?
জমি দখলেরহেতু ঘুরি সেই আশে। মহাপ্রভু বলিয়াছে শুন সর্বজন, তাঁহার আদেশ বাণী মানহ এখন।
আইল প্রেমের বন্যা বীজ হ'ল নাশ,
এই বাক্য অমান্যতে হ'ল সর্বনাশ।
ভক্তি ভরে বিজড়িত নির্বাক রহিল। বহু উপদেশ বাণী ঠাকুর কহিল,
তাঁহার অকাট্য যুক্তি খণ্ডিতে নারিল।
দীক্ষা লওয়ার প্রশ্ন আর না রহিল, প্রেমানন্দে নকুলের দিন বয়ে গেল।
অহনিশি নাম করে পণ্ডিতেরা শোনে, পরম বৈষ্ণব বলি তাঁহারাই ভনে। সাধন ভজনে মগ্ন নাম গানে সদা,
নবদ্বীপে সবে বলে সাধু নামজাদা। মাঘ মাসে হ'ল এক অদ্ভুত ঘটন,
পরিপক্ক আনারস দিল একজন। বলে, 'ঘোষ মহাশয় করহ ভক্ষণ,
প্রসাদে করহ তুষ্ট মম নিবেদন।' অসময়ে আনারস দিয়াছে যখন,
ঠাকুরের কথা তাঁর হইল স্মরণ। কোথা প্রভু রাইচাঁদ দূর দেশে থাকি,
এমন সুন্দর ফল এসে খাও দেখি। কাঁদিতে কাঁদিতে তাঁর জ্ঞান লোপ হ'ল,
আবেশেতে দেখে যেন আশ্রমে আসিল। ঠাকুরের কাছে দিল সেই আনারস,
বাশুড়িয়া ধামে পায় সেই সে সুবাস। আনারস গন্ধ পেয়ে সবে প্রকাশিছে,
আশ্রমেতে আনারস কেবা দিয়া গেছে। এইরূপ সকলেতে করে আলোচনা,
প্রভুপাদ ভাবে ইহা না বলে পারিনা। আমার নকুল আসি আনারস দিল,
তাহার সুগন্ধ সবে এখানে পাইল। দিন ঠিক রাখি ভক্তে পত্র দিয়াছিল,
সত্য সত্য ঘটনাটি জানিতে পারিল। ভক্ত ভগবানের যেই সম্বন্ধ রয়েছে,
উত্তর শুনি সবে আনন্দিত হইল,
সুরসিক যাঁরা মাত্র তাঁরাই জেনেছে। ভক্তি নিবেদন করি যখন যা খায়
প্রাণের ঠাকুর তাহা অবশ্যই পায়।
কলিকাতা নামযজ্ঞ আরম্ভ হইল, তাহাতে চালক সাজি নকুল রহিল।
অবশেষে ঠাকুরের অপ্রকট পর, নকুল করিল নাম প্রেমেতে প্রচার।
ভক্ত নকুলের কিবা তুলনা যে দিব, তাঁর মত মরমিয়া খুঁজিয়া না পাব।
ঠাকুরের বিরহেতে নকুলের মন, দুর্বল হইল দেহ কাঁদে অনুক্ষণ।
ক্রমে ক্রমে জ্বর রোগে আক্রান্ত হইল, বাহির ভাগেতে যেতে মনন করিল।
সতীশ উপেন আর বোস ঠাকুরুন, তিনজন সঙ্গে সঙ্গে করিল গমন।
মাঘ মাস শীত তাহা অতীব ভীষণ, টাবুরিয়া মাঝি তবে বলিছে বচন।
গতরাত্রি বিনিদ্রায় গিয়াছে চলিয়া, এইক্ষণে ঘুমে মোর ধরিছে চাপিয়া।
নকুল বলিছে, 'ঠাণ্ডা বড়ই অসহ্য, আজ যদি রাত্রি জাগে মরণই ধার্য।'
হেনকালে উপেনের ঘুম ভেঙ্গে গেল, স্বপনে কি দেখিয়াছে তাহা সে বলিল।
নকুল ঘোষের বাড়ি যেখানেতে আছে, বিচিত্র একটি স্তম্ভ তথা রহিয়াছে।
বৃক্ষাদির পর দিয়া শ্বেত স্তম্ভ দেখি, বুঝিতে পারিনা দাদা দেখিলাম এ কি? সতীশ বলিছে, ভাই বলি যে তোমায়, বাঁচিবেনা ঘোষ দাদা জানিনু নিশ্চয়।
যখন তরণী গিয়া ঘাটেতে পৌঁছিল, নকুল ঘোষের পত্নী ঘাটেতে আসিল। উপেন দেখিছে তাঁর অন্যরূপখানি, শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা তাঁরে নাহি চিনি।
কিছুক্ষণ পর দেখে লালপাড় আছে, সবাই বুঝিল জ্ঞানে মৃত্যু আসিয়াছে। পরদিন দুপুরেতে রান্না হইয়াছে,
সকলে খাইতে যাবে ইচ্ছা করিয়াছে। নকল ঘোষের কাছে প্রহরী কে থাকে? সতীশ ভাবিছে মনে আমি বলি কাকে?
নিজেই রহিল তবে নকুলের কাছে, এমন সময় তাঁকে নকুল বলিছে। 'বাবা রাইচাঁদ এল ভক্তগণ লয়ে,
এইরূপ শুভ দিন বৃথা যায় বয়ে।' ঠাকুরের সেবা করি হেন সাধ্য নাই,
বসিতে জায়গা নাই কোথাবা কি পাই? সতীশে নকুল বলে, 'বেড়া খুলে দাও, ভক্তগণ বহু আছে জায়গা বানাও।'
আনন্দেতে নকুলের হাসি পাইতেছে,
ক্ষণেক কাঁদিছে আর ক্ষণেক বলিছে। বাবা তুমি আসিয়াছ আমাকে লইতে,
নিশ্চয় যাইব আমি তোমার সঙ্গেতে। ঠাকুর বলিত সব ভক্তদের কাছে,
'তোদের অধীন যম আমি নই মিছে।' শমনের ধার আমি ধারি না কখন,
আমার প্রাণের বন্ধু সেই নিরঞ্জন। সাধু মহাজনে সদা বলিয়াছে তাই,
এইরূপ দেহ মন গড়িতে যে চাই। এমন জীবন হবে করিতে গঠন,
মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন। এইরূপ নানা কথা নিজ মনে কয়,
দেখিতে দেখিতে তাঁর বেলা অস্ত যায়। এই কথা সত্য সত্য নকুলের হ'ল,
মরণ যন্ত্রণা সেই কিছু নাহি পেল।
হাসিতে হাসিতে গেল ঠাকুরের সঙ্গে, প্রফুল্লিত মুখখানি হাসে মন রঙ্গে।
পুণ্য শ্লোক নকুলের আশ্চর্য কাহিনী, শুনিলে প্রারব্ধ নাশ সত্য বলে মানি।
রসরাজ লীলামৃত অতি মধুময়, কলি ভয় তড়াইতে আর কিছু নয়।

পরবর্তী পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন

Post a Comment

0 Comments